নিজস্ব প্রতিনিধি:
দেশে বৃষ্টিপাতের তথ্য কতটা নির্ভুল, তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) কয়েকটি বৃষ্টি পরিমাপক কেন্দ্র আন্তর্জাতিক মানদণ্ড না মেনে বড় গাছের নিচে বা ঘন ছায়াযুক্ত স্থানে স্থাপন করা হয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। এতে প্রকৃত বৃষ্টিপাতের তুলনায় কম বা ত্রুটিপূর্ণ তথ্য রেকর্ড হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
একই এলাকায় পাউবো ও বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের বৃষ্টিপাতের তথ্যে ২১ থেকে ৪৩ মিলিমিটার পর্যন্ত পার্থক্য পাওয়া গেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এমন ত্রুটিপূর্ণ তথ্য জলবায়ু গবেষণা, বন্যা পূর্বাভাস, অবকাঠামো পরিকল্পনা এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। যদিও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, সামগ্রিক বন্যা পূর্বাভাসে এর প্রভাব সীমিত।
বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার নির্দেশনা অনুযায়ী, রেইন গেজ স্থাপনের সময় গাছ, ভবন বা অন্য কোনো প্রতিবন্ধকতা থেকে অন্তত ওই বাধার উচ্চতার দ্বিগুণ দূরত্ব বজায় রাখা প্রয়োজন। এতে বাতাসের প্রভাবে বৃষ্টির ফোঁটা বাধাগ্রস্ত না হয়ে যন্ত্রে পড়তে পারে এবং সঠিক তথ্য সংগ্রহ সম্ভব হয়। তবে দেশের কয়েকটি স্টেশনে এই মানদণ্ড অনুসরণ করা হয়নি বলে সরেজমিনে দেখা গেছে।
সিলেটের শাহী ঈদগাহ এলাকায় পাউবোর একটি বৃষ্টিপাত ও বাষ্পায়ন স্টেশন বড় বড় গাছে ঘেরা অবস্থায় পাওয়া গেছে। সেখানে রেইন গেজের ওপরে মাত্র কয়েক ফুট খোলা জায়গা রয়েছে। গত ২৬ জুন সকাল ৯টা থেকে পরবর্তী ২৪ ঘণ্টায় ওই স্টেশনে ৩৮ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়। একই সময়ে একই এলাকার আবহাওয়া অধিদপ্তরের খোলামেলা স্থানে থাকা স্টেশনে বৃষ্টিপাত রেকর্ড হয় ৫৯ মিলিমিটার। অর্থাৎ দুই প্রতিষ্ঠানের তথ্যে ২১ মিলিমিটারের পার্থক্য দেখা যায়।
কুড়িগ্রামের একটি বৃষ্টি পরিমাপক কেন্দ্রেও বড় গাছের নিচে রেইন গেজ স্থাপনের অভিযোগ রয়েছে। ওই কেন্দ্রটি একটি আমবাগানের মধ্যে স্থাপন করা হয়েছে বলে জানা গেছে। সেখানে দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিকে লোহার বেড়া টপকে গিয়ে বৃষ্টিপাতের তথ্য সংগ্রহ করতে হয় বলেও অভিযোগ উঠেছে।
পাউবোর বিভিন্ন কেন্দ্র ও আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্যে আরও কয়েকটি এলাকায় বড় পার্থক্য দেখা গেছে। গত ২৭ জুন নেত্রকোনার জারিয়া-ঝাঞ্জাইলে বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র ৬ মিলিমিটার বৃষ্টিপাতের তথ্য দিলেও আবহাওয়া অধিদপ্তরের হিসাবে নেত্রকোনায় বৃষ্টিপাত ছিল ৪৯ মিলিমিটার। একই দিনে দিনাজপুরে দুই সংস্থার তথ্যে প্রায় ১২ মিলিমিটারের ব্যবধান পাওয়া যায়। শ্রীমঙ্গল, রাঙামাটি ও বরিশালসহ আরও কয়েকটি এলাকায়ও এ ধরনের পার্থক্যের কথা উঠে এসেছে।
বিডব্লিউসিএসআরপি প্রকল্পের আওতায় ২০২০-২১ অর্থবছরে পানি স্তর, রেইন গেজ ও আবহাওয়া স্টেশন আধুনিকায়নে প্রায় ৭০ কোটি টাকা ব্যয় করা হলেও কিছু ক্ষেত্রে মৌলিক স্থাপনাগত মানদণ্ড অনুসরণ করা হয়নি বলে সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এসব তথ্য শুধু দেশের বন্যা ব্যবস্থাপনায় নয়, আন্তর্জাতিক জলবায়ু ও পানিসম্পদ গবেষণাতেও ব্যবহৃত হয়। ফলে ভুল তথ্য গবেষণার ফলাফলকে প্রভাবিত করতে পারে।
পাউবোর সারফেস ওয়াটার হাইড্রোলজি সার্কেলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী এবিএম মুজাহিদী বলেন, রেইন গেজ স্থাপনে বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার নির্দেশনা অনুসরণ করা হয়। তবে সব জায়গায় নিজস্ব জমি না থাকা, গাছ বড় হয়ে যাওয়া, ব্যক্তিমালিকানাধীন জমিতে গাছ কাটার অনুমতি না পাওয়া এবং চুরির ঝুঁকির কারণে কিছু সীমাবদ্ধতা থাকে।
তিনি জানান, বর্তমানে পাউবোর ২৭৪টি স্টেশন সচল রয়েছে। এর মধ্যে ২৭২টি ডিজিটাল এবং ২৭৪টি ম্যানুয়াল রেইন গেজ রয়েছে। ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে প্রতিদিন সকাল ৯টায় আগের ২৪ ঘণ্টার বৃষ্টিপাত পরিমাপ করে তথ্য রেজিস্টারে লিপিবদ্ধ করা হয়। পরে তা কেন্দ্রীয় ডেটাবেজে পাঠানো হয়। ডিজিটাল রেইন গেজের তথ্য স্বয়ংক্রিয়ভাবে সফটওয়্যারে যুক্ত হয়।
বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের নির্বাহী প্রকৌশলী সরদার উদয় রায়হান বলেন, তাদের বুলেটিনের জন্য নিয়মিত ৮১টি স্টেশন পর্যবেক্ষণ করা হয়। তিনি বলেন, পাউবো ও আবহাওয়া অধিদপ্তরের স্টেশন একই স্থানে না হওয়ায় স্থানীয় বৃষ্টিপাতের তারতম্যের কারণে তথ্যের মধ্যে পার্থক্য হওয়া স্বাভাবিক।
তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশের বন্যার বড় অংশ উজানের বৃষ্টিপাতের কারণে হয়। দেশের অভ্যন্তরীণ বৃষ্টিপাতের অবদান তুলনামূলক কম হওয়ায় স্থানীয় রেইন গেজের তথ্যে কিছু বিচ্যুতি থাকলেও সামগ্রিক বন্যা পূর্বাভাসে তার প্রভাব সীমিত হতে পারে।
তবে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের পানি ও বন্যা ব্যবস্থাপনা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. একেএম সাইফুল ইসলাম বলেন, আন্তর্জাতিক মানদণ্ড না মেনে রেইন গেজ স্থাপন করলে নির্ভুল তথ্য পাওয়া সম্ভব নয়। এতে দীর্ঘমেয়াদি জলবায়ু গবেষণা, স্থানীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা এবং অবকাঠামো নকশা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
তার মতে, কোনো এলাকায় বৃষ্টিপাত প্রকৃতের চেয়ে বেশি দেখানো হলে অবকাঠামো নির্মাণের ব্যয় অপ্রয়োজনীয়ভাবে বেড়ে যেতে পারে। আবার বৃষ্টিপাত কম দেখানো হলে দুর্বল নকশার কারণে ভবিষ্যতে ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। তিনি রেইনফল ডেটার নিয়মিত মান যাচাই এবং তথ্যের গুণগত নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।