৬ই মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ২৩শে বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ | ১৯শে জিলকদ, ১৪৪৭ হিজরি

রাজবাড়ীতে ইউটিউব দেখে আঙুর চাষ, উদ্যোক্তা ওহিদুলের দৃষ্টান্ত

মোঃ আমিরুল হক, রাজবাড়ী প্রতিনিধি:

সাংসারিক কাজের পাশাপাশি ইউটিউব দেখে শখের বসে আঙুর চাষ শুরু করেছেন মোঃ ওহিদুল ইসলাম মন্ডল। সেই শখ এখন রূপ নিয়েছে সম্ভাবনাময় উদ্যোগে। রাজবাড়ীর কালুখালী উপজেলার মদাপুর ইউনিয়নের শীবানন্দপুর গ্রামের এই কৃষক ইতোমধ্যে বাণিজ্যিকভাবে বাইকুনুর সহ মোট চারটি জাতের আঙুর চাষে সফলতার আশা দেখাচ্ছেন।

কালুখালীর মদাপুর ইউনিয়নের শীবানন্দপুর গ্রামের প্রান্তিক চাষি মোঃ ওহিদুল ইসলাম মন্ডল জানান, ময়মনসিংহের ভালুকা উপজেলার একটি আঙুর বাগান পরিদর্শনে গিয়ে তার আগ্রহের সূচনা। এরপর ইউটিউবের বিভিন্ন ভিডিও দেখে পরিকল্পনা করে বাড়ীর কাছে ৩ পাখি অর্থাৎ ৬৬ শতাংশ জমিতে শুরু করেন আঙুর বাগান। দর্শনার জীবননগর, ফরিদপুর, ময়মনসিংহ ও ঝিনাইদহ থেকে আঙুর চারা সংগ্রহ করেন তিনি।

প্রথমে ৪০০টি চারা রোপণ করলেও ২০-২৫টি নষ্ট হয়ে যায়। পরে আবার চারা সংগ্রহ করে বর্তমানে তার বাগানে ৪০০টি গাছ রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় প্রত্যেকটি গাছে ইতোমধ্যে থোকায় থোকায় আঙুর ধরেছে। বাগানে বাইকুনুন, একুলো, জুঁই, ব্লাকম্যাজিক ও ব্যালেক্স জাতের প্রায় ৪০০ গাছ রয়েছে এবং আর কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই ফল বিক্রির উপযোগী হবে বলে আশা করছেন তিনি।

ওহিদুল বলেন, “শখ থেকেই শুরু করেছি। ইউটিউব দেখে বাইকুনুন, একুলো, ব্যালেক্স, জুঁই, ব্লাকম্যাজিক জাতের আঙুর চাষে আগ্রহ পাই। শুরুতে অনেকেই সন্দেহ করলেও এখন গাছে ফল দেখে সবাই উৎসাহ দিচ্ছে।”

তিনি আরও জানান, “গাছের গোড়ায় পানি জমে থাকা, পোকামাকড় ও পাখির আক্রমণ নিয়ন্ত্রণ করা আঙুর চাষের বড় চ্যালেঞ্জ। ভবিষ্যতে আরও ২-৩ পাখি জমিতে আঙুর চাষ সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে তার।”

সার-কীটনাশক ব্যবহার সম্পর্কে উদ্দোক্তা ওহিদুল ইসলাম বলেন, “আঙুর চাষে সার কীটনাশক খরচ খুবই কম। গাছ রোপনের আগে পটাশ, এমওপি, ডিএপি, জিপসাম ও বেশি পরিমাণে জৈব সার ব্যবহার করতে হয়। তবে রাসায়নিক সারের পরিমাণ খুবই কম দিতে হয়।”

রাজবাড়ীর পাংশা, গোয়ালন্দ, বালিয়াকান্দি উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় আরও কয়েকজন উদ্যোক্তা আঙুর চাষে আগ্রহী হয়ে এগিয়ে আসছেন।

জেলার বিভিন্ন ইউনিয়নের প্রত্যন্ত গ্রামের কৃষি উদ্যোক্তাগণ তাদের জমিতে নানান প্রজাতির আঙুর গাছ লাগানোর প্রস্তুতি গ্রহণ করছেন।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, আঙুর গাছ রোপণের মাত্র নয় মাসের মধ্যেই ফলন আসায় উদ্যোক্তার আত্মবিশ্বাস বেড়েছে। পাখির আক্রমণ থেকে রক্ষা পেতে বাগানে জাল ব্যবহারের পরামর্শ দিচ্ছেন স্থানীয় সুধিজনরা।

পাশ্ববর্তী সুরুজদিয়া গ্রামের গৃহবধূ আসমা খাতুন জানান, “আমি আমার শ্বশুর বাড়ী থেকে এখানে বাবার বাড়ীতে বেড়াতে এসেছি। আঙুর চাষি ওহিদুল ইসলাম আমার মামা। তিনি আমার বাবার বাড়ীর পাশেই আঙুর বাগান করেছেন। গাছো থোকায় থোকায় আঙুর ধড়েছে। দেখতে অনেক সুন্দর লাগছে। এই দৃশ্য দেখতেই মুলত এখানে আসা।”

শীবানন্দপুর গ্রামের গাড়ীচালক মোঃ রবিউল হুসাইন কলেন, “আমরা মুলত বাজার থেকে আঙুর কিনে এনে খাই। আমাদের বাড়ীর পাশেই এতো সুন্দর আঙুর বাগান হয়েছে আর তাতে অনেক পরিমানে আঙুর ধরেছে দেখতে খুবই ভালো লাগছে।”

পাংশা উপজেলার কাচারীপাড়া সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মোঃ মামুনুর রশীদ জানান, “বেশ কয়েকদিন ধরে শুনছি কালুখালী উপজেলার মদাপুর ইউনিয়নের শীবানন্দপুর গ্রামের ওহিদুল ইসলাম বড় পরিসরে আঙুর বাগান করেছেন। দেখতে আসবো আসবো করে আজ সময় নিয়ে দেখতে এসেছি। এখানে এসে গাছে থোকায় থোকায় আঙুর দেখে আমি মুগ্ধ হয়ে গেছি।”

বালিয়াকান্দি সরকারী কলেজের প্রভাষক মোঃ রাকিবুল হাসান রাসেল বলেন, “আমারও একটি বাগান রয়েছে। সেখানে বাউকুল, আপেলকুল, বিভিন্ন প্রজাতির আম, মালটোভা ও আঙুর চারা রোপন করা রয়েছে। আমি নিজেও একজন উদ্দোক্তা। এখানে দেখতে এসেছি কেমন করে চাষ করেছেন। এবং ফলন হয়েছে কেমন। এসে দেখলাম খুব সুন্দর করে বাগান সাঁজিয়েছেন চাষি ওহিদুল ইসলাম। তার বাগানে থোকায় থোকায় আঙুর দেখে চোখ জুড়িয়ে গেছে। আশা করছি ভালোভাবে তুলতে পারলে লাভের মুখ দেখবেন এই কৃষি উদ্দোক্তা।”

কালুখালী উপজেলা কৃষি অফিসার কৃষিবিদ পুর্ণিমা হালদার বলেন, “কালুখালীর মাটিতে আঙুর চাষ করে একজন প্রান্তিক কৃষক নতুন সম্ভাবনা তৈরি করছেন। উপজেলা কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে তাকে প্রয়োজনীয় সব ধরনের সহায়তা দেওয়া হচ্ছে।”

স্থানীয়দের মতে, এ ধরনের উদ্যোগ তরুণদের কৃষির প্রতি আগ্রহী করে তুলবে। সঠিক দিকনির্দেশনা ও প্রযুক্তির ব্যবহার নিশ্চিত করা গেলে কালুখালীতে আঙুর চাষ বাণিজ্যিকভাবে বিস্তৃত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

ফেসবুকে আমরা

মন্তব্য করুন

guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments

সর্বাাধিক পঠিত নিউজ

Scroll to Top