আব্দুল মাবুদ মোহাম্মদ ইউসুফ, মনোহরদী, নরসিংদী প্রতিনিধি:
বাংলাদেশ সরকার ধর্মীয় মূল্যবোধ, নৈতিকতা ও ইসলামী সংস্কৃতির বিকাশে যুগান্তকারী উদ্যোগ হিসেবে দেশের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলায় ৫৬৪টি মডেল মসজিদ ও ইসলামিক সাংস্কৃতিক কেন্দ্র নির্মাণ করেছে। দৃষ্টিনন্দন স্থাপত্য, আধুনিক সুযোগ-সুবিধা এবং বহুমুখী ধর্মীয় কার্যক্রমের মাধ্যমে এসব মডেল মসজিদ আজ দেশের মানুষের প্রশংসা অর্জন করেছে। এটি নিঃসন্দেহে সরকারের একটি দূরদর্শী ও প্রশংসনীয় উদ্যোগ।
কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হলো, এই বিশাল প্রকল্পের মূল চালিকাশক্তি হিসেবে যারা দিনরাত নিরলসভাবে কাজ করছেন, সেই ইমাম, মুয়াজ্জিন ও খাদিমগণ আজ অবহেলা, আর্থিক সংকট ও মানবেতর জীবনযাপনের মধ্য দিয়ে দিন কাটাচ্ছেন। বাহ্যিক চাকচিক্যের আড়ালে তাদের জীবনের কষ্টগুলো যেন অদৃশ্য থেকে যাচ্ছে।
বর্তমানে একজন মডেল মসজিদের ইমামকে মাসিক মাত্র ১৫ হাজার টাকা, মুয়াজ্জিনকে ১০ হাজার টাকা এবং খাদিমকে ৭ হাজার ৫০০ টাকা সম্মানী প্রদান করা হয়। বর্তমান দ্রব্যমূল্যের বাজারে এই সামান্য আয়ে একটি পরিবার পরিচালনা করা অত্যন্ত কঠিন। বাড়িভাড়া, সন্তানদের পড়াশোনা, চিকিৎসা, পোশাক, যাতায়াত ও নিত্যপ্রয়োজনীয় খরচ মেটাতে গিয়ে তারা প্রতিনিয়ত হিমশিম খাচ্ছেন।
আরও দুঃখজনক বিষয় হলো, চাকরিতে যোগদানের পর বছরের পর বছর অতিবাহিত হলেও নেই কোনো বাৎসরিক ইনক্রিমেন্ট, নেই বেতন বৃদ্ধি, নেই উন্নত ভবিষ্যতের নিশ্চয়তা। পাঁচ বছর আগে যে বেতনে একজন চাকরিতে যোগদান করেছেন, আজও তিনি একই বেতনে দায়িত্ব পালন করছেন। অথচ দেশের অন্যান্য অনেক সেক্টরে নিয়মিত বেতন বৃদ্ধি ও সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি পাচ্ছে।
বাস্তবতা হলো, মডেল মসজিদের দায়িত্ব শুধু পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পরিচালনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এখানে ইমাম, মুয়াজ্জিন ও খাদিমগণকে ২৪ ঘণ্টা দায়িত্বের মধ্য দিয়ে থাকতে হয়। নামাজ, কুরআন শিক্ষা, দারস, ইসলামিক সাংস্কৃতিক কার্যক্রম, ধর্মীয় পরামর্শ, দাফতরিক কার্যক্রম, অতিথি সেবা, মসজিদের পরিচ্ছন্নতা ও সার্বিক তদারকিসহ বহুমুখী কাজ তাদের করতে হয়।
এছাড়াও তারা প্রশাসনিক বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করে থাকেন। জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের বিভিন্ন ধর্মীয় কার্যক্রম বাস্তবায়নে তারা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। সরকারের বিভিন্ন জনসচেতনতামূলক প্রচারণা। যেমন: জঙ্গিবাদ বিরোধী কার্যক্রম, মাদক বিরোধী প্রচারণা, সামাজিক সচেতনতা, স্বাস্থ্যবিষয়ক বার্তা, দুর্যোগকালীন নির্দেশনা ও জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা দ্রুত ও ব্যাপকভাবে জনগণের মাঝে পৌঁছে দিতে মডেল মসজিদের ইমামগণ বিশেষ ভূমিকা পালন করেন।
শুধু তাই নয়, সমাজে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা, সামাজিক সম্প্রীতি বজায় রাখা এবং ধর্মীয় উগ্রবাদ প্রতিরোধেও তারা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলেছেন। উপজেলা ও জেলার বিভিন্ন ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব, মাদরাসা, মসজিদ এবং প্রশাসনের মধ্যে সমন্বয় ও সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখতে মডেল মসজিদের ইমামগণ নিরব সেতুবন্ধন হিসেবে কাজ করছেন।
একজন ইমাম শুধু নামাজের নেতৃত্বদানকারী ব্যক্তি নন, তিনি সমাজের নৈতিক শিক্ষক, ধর্মীয় অভিভাবক ও মানবিক পথপ্রদর্শক। একজন মুয়াজ্জিন ইসলামের আহ্বান মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেন। আর একজন খাদিম নীরবে মসজিদের পবিত্র পরিবেশ বজায় রাখতে অক্লান্ত পরিশ্রম করেন। অথচ সমাজের এই গুরুত্বপূর্ণ মানুষগুলোর জীবন আজ অনিশ্চয়তা ও অবহেলায় নিমজ্জিত।
মডেল মসজিদ প্রকল্পের প্রকৃত সফলতা তখনই অর্জিত হবে, যখন শুধু ভবনের সৌন্দর্য নয়, বরং এই প্রতিষ্ঠান পরিচালনাকারী মানুষগুলোর জীবনমানও উন্নত হবে। তাই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে জোর দাবি, মডেল মসজিদের ইমাম, মুয়াজ্জিন ও খাদিমদের জন্য যুগোপযোগী বেতন কাঠামো, নিয়মিত ইনক্রিমেন্ট, চিকিৎসা সুবিধা, আবাসন সুবিধা ও চাকরির নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।
রাষ্ট্র যদি সত্যিকার অর্থে ধর্মীয় মূল্যবোধ ও মানবিক মর্যাদাকে গুরুত্ব দিতে চায়, তবে মডেল মসজিদের এই নিবেদিতপ্রাণ মানুষগুলোর ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করার এখনই সময়। অন্যথায় দৃষ্টিনন্দন ভবনের আড়ালে তাদের দীর্ঘশ্বাসই একদিন সবচেয়ে বড় বাস্তবতা হয়ে দাঁড়াবে।