মো. সাইফুল ইসলাম, নীলফামারী প্রতিনিধি:
কৃষিপ্রধান জেলা নীলফামারীতে চলতি বোরো মৌসুমে ধানের বাম্পার ফলন হলেও বাজারে কাঙ্ক্ষিত দাম না পাওয়ায় হতাশ হয়ে পড়েছেন কৃষকরা। সার, সেচ, বীজ, কীটনাশক ও শ্রমিকের বাড়তি মজুরিতে উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি পেলেও সেই অনুপাতে ধানের দাম না বাড়ায় লোকসানের মুখে পড়েছেন তারা। ফলে ভবিষ্যতে অনেক কৃষক ধানের পরিবর্তে ভুট্টাসহ অন্যান্য লাভজনক ফসল চাষে ঝুঁকতে পারেন বলে আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
জেলার বিভিন্ন উপজেলা ঘুরে দেখা যায়, মাঠজুড়ে এখন ধান কাটার ব্যস্ততা। বাতাসে দুলছে বোরো ধানের সোনালি শীষ। কেউ কাস্তে দিয়ে ধান কাটছেন, কেউ আঁটি বেঁধে বাড়িতে নিচ্ছেন, আবার কেউ ভ্যান ও ট্রলিতে করে নতুন ধান তুলছেন গোলায়। তবে ভালো ফলনের আনন্দ অনেকটাই ম্লান হয়ে গেছে বাজারে ধানের দরপতনের কারণে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে নীলফামারীতে ৮১ হাজার ৮৫৯ হেক্টর জমিতে বোরো ধানের আবাদ হয়েছে। উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৩ লাখ ৭৪ হাজার ৯০১ মেট্রিক টন চাল। ইতোমধ্যে জেলার প্রায় ১০ থেকে ১৫ শতাংশ ধান কাটা সম্পন্ন হয়েছে।
চওড়া বড়গাছা ইউনিয়নের কৃষক মিজানুর রহমান বলেন, “দেশে সবকিছুর দাম যেভাবে বাড়ছে, কৃষকের উৎপাদিত ফসলের দাম সেভাবে বাড়ছে না। এবার তিন একর জমিতে আলু চাষ করেছিলাম, সেখানে বড় ধরনের লোকসান হয়েছে। বাজারে আলুর কেজি ৫ থেকে ৬ টাকা। অনেক আলু ঘরে রেখেই নষ্ট হচ্ছে।”
কিসামত ভুটিয়ান এলাকার কৃষক আব্দুল জলিল হোসেন বলেন, “দুই বিঘা জমিতে ধান চাষ করতে প্রায় ৩০ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। অথচ বিক্রি হবে ২৫ হাজার টাকার মতো। এভাবে ধান চাষ করে লাভ নেই। আগামীতে ধানের পরিবর্তে ভুট্টা চাষ করবো।”
লক্ষীচাপ নিমতলী এলাকার কৃষক ললিত চন্দ্র রায় জানান, এ বছর আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় ফলন ভালো হয়েছে। প্রতি বিঘায় ১৫ থেকে ২২ মণ পর্যন্ত ধান পাওয়া যাচ্ছে। তবে ধানের দাম কম হওয়ায় লাভের বদলে লোকসানের আশঙ্কা করছেন কৃষকরা।
শহরের মানিকের মোড় এলাকার কৃষক রজব আলী বলেন, “দিন দিন বাড়ছে বিদ্যুতের দাম, সার, কীটনাশক ও শ্রমিকের মজুরি। সব মিলিয়ে উৎপাদন খরচ অনেক বেড়ে গেছে। ধানে লোকসান হলে কৃষক একসময় চাষাবাদ বন্ধ করে দিতে বাধ্য হবে।”
জেলার বিভিন্ন হাট-বাজারে গিয়ে দেখা যায়, ধানের দামে বড় ধরনের পতন হয়েছে। মীরগঞ্জ হাটে এক সপ্তাহ আগেও প্রতি মণ হাইব্রিড ধান বিক্রি হয়েছে প্রায় ১ হাজার টাকায়। বর্তমানে সেই ধান বিক্রি হচ্ছে ৭৫০ থেকে ৮০০ টাকায়। কৃষকরা বলছেন, এই দামে ধান বিক্রি করলে উৎপাদন খরচই উঠবে না। সংসারের প্রয়োজন ও ঋণের চাপ সামলাতে বাধ্য হয়েই কম দামে ধান বিক্রি করতে হচ্ছে।
পলাশবাড়ী ইউনিয়ন কৃষকদলের সভাপতি মো. কাফি মিয়া বলেন, “এক বিঘা জমিতে শুধু সেচের পানির জন্যই তিন হাজার টাকা পর্যন্ত খরচ হচ্ছে। এছাড়া সার, ওষুধ, শ্রমিক, মাড়াই ও পরিবহন খরচও অনেক বেড়েছে। কিন্তু ধানের ন্যায্যমূল্য পাচ্ছেন না কৃষকরা।”
কৃষি সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মৌসুমের শুরুতে বাজারে ধানের অতিরিক্ত সরবরাহ ও সরকারি ক্রয় কার্যক্রম পুরোপুরি শুরু না হওয়ায় মধ্যস্বত্বভোগীরা কম দামে ধান কিনে নিচ্ছেন। ফলে কৃষকরা ন্যায্য দাম থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
নীলফামারী সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আতিক হাসান বলেন, “এ বছর আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় ফলন ভালো হয়েছে। পোকামাকড়ের আক্রমণ কম থাকায় কীটনাশকের ব্যবহারও তুলনামূলক কম হয়েছে। চলতি মাসের মধ্যেই জেলার অধিকাংশ ধান কাটা শেষ হবে বলে আশা করছি।”
নীলফামারী কৃষি বিপণন কর্মকর্তা উম্মে কুলসুম বলেন, “বর্তমানে বাজারে ধানের সরবরাহ বেড়ে যাওয়ায় দাম কিছুটা কমে গেছে। তবে সরকারিভাবে ধান সংগ্রহ কার্যক্রম দ্রুত শুরু হলে বাজার পরিস্থিতির উন্নতি হবে বলে আশা করছি। কৃষকদের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে সরকার বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করছে। কৃষকদের সরাসরি সরকারি ক্রয়কেন্দ্রে ধান বিক্রির বিষয়ে উদ্বুদ্ধ করা হচ্ছে।”
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপ-পরিচালক মনজুর রহমান বলেন, “সরকার নির্ধারিত দামে ধান ক্রয় কার্যক্রম শুরু হলে বাজারদর স্থিতিশীল হবে। চলতি মৌসুমে জেলায় ৮১ হাজার ৮৫৯ হেক্টর জমিতে ধান আবাদ হয়েছে। কৃষকদের সহায়তায় জেলার বিভিন্ন এলাকায় ৭৮টি কম্বাইন হারভেস্টার মেশিন কাজ করছে।”
কৃষকদের দাবি, উৎপাদন খরচের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ধানের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা না হলে ভবিষ্যতে খাদ্য উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। তাই দ্রুত সরকারি ক্রয় কার্যক্রম জোরদার, কৃষকদের কাছ থেকে সরাসরি ধান সংগ্রহ এবং কৃষি উপকরণের দাম নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা।