নিজস্ব প্রতিনিধি:
দেশের কারাগারগুলোতে অবকাঠামোগত উন্নয়ন হলেও বন্দিদের জীবনযাত্রার মান এখনো উদ্বেগজনক অবস্থায় রয়েছে। ধারণক্ষমতার তুলনায় দ্বিগুণ-তিনগুণ বেশি বন্দি থাকায় কারাগারগুলোতে তৈরি হয়েছে মানবিক সংকট। এর সঙ্গে অপুষ্টিকর খাবার ও স্বাস্থ্যসেবার সীমাবদ্ধতায় বাড়ছে নানা রোগব্যাধির ঝুঁকি।
বর্তমানে দেশের ৭৫টি কারাগারের মোট ধারণক্ষমতা ৪৩ হাজার ১৫৭ জন হলেও সেখানে বন্দি রয়েছেন ৮৫ হাজারের বেশি। ১৫টি কেন্দ্রীয় কারাগারে ২২ হাজার ৩৮০ জনের জায়গায় বন্দি আছেন প্রায় ৪০ হাজার।
ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে ৪ হাজার ৫৯০ জনের ধারণক্ষমতার বিপরীতে বন্দি রয়েছেন ১০ হাজার ১৪৫ জন। চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারে ১ হাজার ৮৫৩ জনের জায়গায় রয়েছেন ৬ হাজার ১০৬ জন বন্দি। কাশিমপুরের বিভিন্ন কারাগারেও একই চিত্র দেখা যাচ্ছে।
অতিরিক্ত বন্দির কারণে ঘুমানো, খাওয়া ও টয়লেট ব্যবহারের মতো মৌলিক প্রয়োজন মেটাতেও বন্দিদের প্রতিনিয়ত ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। অনেক কারাগারে বন্দিদের পালাক্রমে ঘুমাতে হচ্ছে। গরম ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে চর্মরোগ, শ্বাসকষ্ট ও সংক্রামক রোগ ছড়িয়ে পড়ছে দ্রুত।
কারা কর্তৃপক্ষের তথ্যমতে, বন্দিদের খাদ্য তালিকায় কিছু পরিবর্তন আনা হয়েছে। সকালের নাশতায় খিচুড়ি, সবজি-রুটি ও হালুয়া যুক্ত করা হয়েছে। দুপুর ও রাতে ভাতের সঙ্গে মাছ, মাংস, ডাল ও সবজি দেওয়া হচ্ছে। তবে বাস্তবে খাবারের মান ও পুষ্টিগুণ নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
বন্দিদের অভিযোগ, মাছ বা মাংসের পরিমাণ খুবই কম এবং ডাল এতটাই পাতলা যে তা থেকে প্রয়োজনীয় পুষ্টি পাওয়া সম্ভব হয় না। অতিরিক্ত সেদ্ধ সবজি ও নিম্নমানের তেল ব্যবহারের কারণে খাবারের পুষ্টিমানও নষ্ট হয়ে যায়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বড় পরিসরে রান্নার সময় বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি অনুসরণ না করায় খাবারের গুণগত মান বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে বন্দিদের মধ্যে অপুষ্টিজনিত নানা সমস্যা বাড়ছে। নারী ও বৃদ্ধ বন্দিদের মধ্যে আয়রন, ভিটামিন বি, ভিটামিন সি ও জিংকের ঘাটতি বেশি দেখা যাচ্ছে।
কারাগারের অভ্যন্তরে আর্থিক বৈষম্যও স্পষ্ট। যেসব বন্দির আর্থিক সামর্থ্য আছে, তারা প্রিজন ক্যান্টিন থেকে ডিম, দুধ ও ফল কিনে অতিরিক্ত পুষ্টি নিশ্চিত করতে পারছেন। তবে অধিকাংশ নিম্নবিত্ত বন্দি সে সুযোগ থেকে বঞ্চিত।
কারাগারে অতিরিক্ত বন্দির মূল কারণ হিসেবে বিচারাধীন মামলার দীর্ঘসূত্রতা, জামিন প্রক্রিয়ার জটিলতা এবং ছোটখাটো অপরাধেও কারাগারে পাঠানোর প্রবণতাকে দায়ী করছেন সংশ্লিষ্টরা। বর্তমানে কারাগারে থাকা বন্দিদের বড় অংশই হাজতি, অর্থাৎ যাদের বিচার এখনো শেষ হয়নি।
অতিরিক্ত আইজি (প্রিজন্স) মো. জাহাঙ্গীর কবির জানিয়েছেন, বন্দিদের চাপ কমানো এবং তাদের পুষ্টিমান উন্নয়নে সরকারের কাছে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। অনুমোদন পেলে পরিস্থিতির উন্নতি হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।