নিজস্ব প্রতিনিধি:
দেশের ছয়টি বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানি খুচরা পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম প্রতি ইউনিটে ৮৫ পয়সা থেকে ২ টাকা ৫ পয়সা পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছে। এ প্রস্তাবের ওপর বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) আয়োজিত গণশুনানিতে অংশ নিয়ে গ্রাহক প্রতিনিধি, ব্যবসায়ী ও বিশেষজ্ঞরা তীব্র আপত্তি জানিয়েছেন।
রাজধানীর কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশনে অনুষ্ঠিত এই গণশুনানিতে বক্তারা বলেন, বিদ্যুৎ খাতে দুর্নীতি, সিস্টেম লস ও অপ্রয়োজনীয় ব্যয়ের দায় সাধারণ মানুষের ওপর চাপানো ঠিক হবে না। বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হলে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষের জীবনযাত্রা আরও কঠিন হয়ে পড়বে।
গণশুনানিতে জানানো হয়, বর্তমানে দেশে বিদ্যুতের গ্রাহক প্রায় ৪ কোটি ৯৮ লাখ। এর মধ্যে আবাসিক গ্রাহক ৪ কোটির বেশি এবং প্রায় ১ কোটি ৭৮ লাখ গ্রাহক লাইফলাইন সুবিধার আওতায় রয়েছেন, যারা মাসে ৭৫ ইউনিট পর্যন্ত বিদ্যুৎ ব্যবহার করেন।
পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড (আরইবি) লাইফলাইন সুবিধা সীমিত করার প্রস্তাব দিয়েছে। তারা ৫০ ইউনিট পর্যন্ত ব্যবহারকারীদের জন্য আলাদা ধাপ রেখে ৭৫ ইউনিট পর্যন্ত স্বল্পমূল্যের বিদ্যুৎ সুবিধা বাতিলের সুপারিশ করেছে।
এ বিষয়ে কমিউনিস্ট পার্টির সাবেক সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেন প্রিন্স বলেন, গরিব গ্রাহকদের জন্য বরাদ্দকৃত স্বল্পমূল্যের বিদ্যুৎ সুবিধা বাতিল করা যাবে না। বরং ৭৫ ইউনিট পর্যন্ত বিদ্যুৎ ব্যবহারকারীদের বিনামূল্যে বিদ্যুৎ দেওয়ার দাবি জানান তিনি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক মোসাহিদা সুলতানা বলেন, বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর পরিবর্তে খাতে অপচয় ও দুর্নীতি কমানোর উদ্যোগ নেওয়া উচিত। তিনি উল্লেখ করেন, বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) প্রতিবছর বিপুল অঙ্কের ক্যাপাসিটি চার্জ দিচ্ছে, যা বিদ্যুৎ খাতের বড় বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ড্যাফোডিল ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক মিজানুর রহমান বলেন, সিস্টেম লস, দুর্নীতি ও অপ্রয়োজনীয় প্রকল্পের কারণে বিদ্যুৎ খাতে ব্যাপক অর্থ অপচয় হচ্ছে। এসব বন্ধ না করে বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর প্রস্তাব জনগণের জন্য গ্রহণযোগ্য নয়।
স্টিলমিল মালিকদের পক্ষ থেকেও বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির বিরোধিতা করা হয়। বাংলাদেশ স্টিলমিল ম্যানুফ্যাকচারার অ্যাসোসিয়েশনের প্রতিনিধি জাহাঙ্গীর আলম বলেন, উচ্চচাপের বিদ্যুতের জন্য শিল্প উদ্যোক্তারা নিজেদের অর্থে সাব-স্টেশন স্থাপন করেছেন। এরপরও তাদের কাছ থেকে অতিরিক্ত চার্জ নেওয়া অযৌক্তিক।
গণশুনানিতে বিভিন্ন বিতরণ কোম্পানি যে হারে দাম বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছে, তার মধ্যে রয়েছে— পিডিবি প্রতি ইউনিটে ৮৫ পয়সা, আরইবি ১ টাকা ৭৭ পয়সা, ডিপিডিসি ১ টাকা ৫৪ পয়সা, ডেসকো ১ টাকা ৯৮ পয়সা, ওজোপাডিকো ১ টাকা ৩৯ পয়সা এবং নেসকো ২ টাকা ৫ পয়সা।
তবে বিইআরসির কারিগরি দল গড়ে প্রতি ইউনিটে ১ টাকা ২৫ পয়সা দাম বাড়ানোর সুপারিশ করেছে।
শুনানিতে আরও বলা হয়, আবাসিক বিদ্যুতের সংযোগ ব্যবহার করে অনেকেই অবৈধভাবে ব্যাটারিচালিত রিকশা চার্জিং স্টেশন পরিচালনা করছেন। এ ধরনের অপব্যবহার বন্ধে ব্যবস্থা নেওয়ারও দাবি ওঠে।
সব পক্ষের বক্তব্য শোনার পর বিইআরসির চেয়ারম্যান জানান, শুনানিতে উত্থাপিত সব মতামত রেকর্ড করা হয়েছে। সবদিক বিবেচনা করে কমিশন পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেবে।