২রা জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ১৯শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ | ১৬ই জিলহজ, ১৪৪৭ হিজরি

বাংলাদেশের দুগ্ধশিল্প: বর্তমান সংকট, বাস্তবতা ও উত্তরণের পথ

আরাফাত হোসাইন, বাকৃবি প্রতিনিধি:
হাজার বছর আগে থেকে পৃথিবীর প্রতিটি ধর্মেই দুধের মাহাত্ম্য অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে বর্ণিত হয়েছে। পবিত্র কুরআনের সূরা নাহলের ৬৬ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, “অবশ্যই (গৃহপালিত) চতুষ্পদ জন্তুর মধ্যে তোমাদের জন্য শিক্ষা রয়েছে; ওগুলির উদরস্থিত গোবর ও রক্তের মধ্য হতে তোমাদেরকে আমি পান করাই বিশুদ্ধ দুধ, যা পানকারীদের জন্য সুস্বাদু।”

একইভাবে হিন্দুধর্মে দুধকে ‘ঐশ্বরিক সম্পদ’ ও অমৃতের সমতুল্য মনে করা হয়। বৌদ্ধধর্মে ভিক্ষুদের জন্য এটি অন্যতম অনুমোদিত খাবার। খ্রিস্টধর্মে দুধকে আধ্যাত্মিক পুষ্টির প্রতীক এবং ইহুদিধর্মে দুগ্ধজাত খাদ্যকে ধর্মীয় প্রথার অংশ হিসেবে গণ্য করা হয়। এই সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় সংযোগ প্রমাণ করে যে, দুগ্ধ উৎপাদন কেবল একটি কৃষি কাজ নয়, এটি একটি সভ্যতা রক্ষার দায়বদ্ধতা।

বাংলাদেশের দুগ্ধশিল্পের বর্তমান সংকট, বাস্তবতা এবং এ থেকে উত্তরণের পথ সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) পশুপালন অনুষদের শেষ বর্ষের শিক্ষার্থী সাকিব ইফতেখার ইসলাম।

পৃথিবীর সবচেয়ে পুষ্টিগুণসম্পন্ন খাবারের তালিকা করলে ‘দুধ’ নিশ্চিতভাবেই তালিকার শীর্ষে স্থান পাবে। একে প্রকৃতির এক বিস্ময়কর ও সুষম পানীয় হিসেবে গণ্য করা হয়। দুধের অসাধারণ বৈশিষ্ট্য হলো এতে মানুষের শরীর গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় শর্করা (ল্যাকটোজ), উচ্চমানের প্রোটিন (ক্যাসিন ও হুই), অত্যাবশ্যকীয় চর্বি, ভিটামিন (এ, বি-১২, ডি) এবং খনিজ উপাদানের (ক্যালসিয়াম, ফসফরাস) এক আদর্শ সমন্বয় রয়েছে। জন্মের পর একটি শিশুর জন্য মায়ের দুধ যেমন অপরিহার্য, তেমনি পরবর্তী জীবনে শারীরিক গঠন ও মেধার বিকাশে গবাদিপশুর দুধের কোনো বিকল্প নেই।

এই দুধ উৎপাদন কেবল কোনো সাধারণ শারীরিক প্রক্রিয়া নয়, বরং এটি একটি জটিল হরমোনাল ও শারীরবৃত্তীয় প্রকৌশল। একটি গাভী যখন মা হওয়ার পর্যায়ে পৌঁছায়, তখন তার শরীরে প্রোল্যাকটিন এবং অক্সিটোসিনের মতো হরমোনের নিঃসরণ বৃদ্ধি পায়। এই হরমোনগুলোর প্রভাবে গাভীর স্তন গ্রন্থির অভ্যন্তরে থাকা ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ‘অ্যালভিওলাই’ কোষগুলোতে দুধ জমা হতে থাকে। যখন বাছুর তার মায়ের ওলানে মুখ দেয় অথবা দোহনকারী যখন ওলান স্পর্শ করে, তখন সেই উদ্দীপনা সরাসরি মস্তিষ্কে পৌঁছায় এবং অক্সিটোসিন হরমোন নিঃসরণের মাধ্যমে দুধের প্রবাহকে নালিপথে ঠেলে দেয়। একে বিজ্ঞানের ভাষায় ‘লেট-ডাউন’ রিফ্লেক্স বলা হয়। এই প্রাকৃতিক ও সংবেদনশীল প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই আমরা প্রকৃতির সেরা পুষ্টির নির্যাসটি পেয়ে থাকি। এই প্রক্রিয়ার কোনো একটি পর্যায়ে বিঘ্ন ঘটলে দুধের মান ও পরিমাণ উভয়ই ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

এত গুরুত্বপূর্ণ খাদ্য হওয়া সত্ত্বেও বাংলাদেশে দুধের চাহিদার তুলনায় উৎপাদন এখনো পর্যাপ্ত নয়। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের ২০২৪-২৫ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশে দুধের বার্ষিক চাহিদা ১৬২.৩৩ লাখ মেট্রিক টন। এর বিপরীতে উৎপাদন হচ্ছে ১৫৫.৩৮ লাখ মেট্রিক টন। যদিও আমরা স্বনির্ভরতার খুব কাছাকাছি পৌঁছেছি, তবুও মাথাপিছু প্রাপ্যতার হিসেবে চিত্রটি এখনো সন্তোষজনক নয়।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের প্রতিদিন গড়ে ২৫০ মিলিলিটার দুধ পান করা উচিত। কিন্তু বাংলাদেশে বর্তমানে আমরা মাথাপিছু ২৩৯.২৯ মিলিলিটার সরবরাহ করতে পারছি। অর্থাৎ, প্রতিদিন একজন মানুষ গড়ে ১০ মিলিলিটারের বেশি দুধের ঘাটতিতে থাকছে। উচ্চমূল্য এবং সঠিক বিপণন ব্যবস্থার অভাবে সাধারণ মানুষের কাছে দুধ এখনো অনেক ক্ষেত্রে বিলাসিতা হিসেবে গণ্য হয়। এই ঘাটতি পূরণ করা না গেলে জাতীয় পর্যায়ে মেধার বিকাশ এবং দীর্ঘমেয়াদী পুষ্টির নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়বে।

দুধের এই চাহিদা বৃদ্ধি এবং জাতীয় পর্যায়ে অপুষ্টি দূর করতে সরকারি উদ্যোগে ‘স্কুল মিল্ক প্রোগ্রাম’ চালু করা এখন সময়ের দাবি। বিশ্বের অনেক উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিশুদের প্রতিদিন বিনামূল্যে দুধ সরবরাহ করা হয়। এটি একদিকে যেমন শিশুদের শারীরিক ও মেধা বিকাশে সহায়তা করবে, অন্যদিকে খামারিদের জন্য একটি স্থায়ী ও নিশ্চিত বাজার তৈরি করবে। সরকার যদি মিড-ডে মিলের সাথে এক গ্লাস দুধ বাধ্যতামূলক করে, তবে দুগ্ধ খাতের উৎপাদনকারীরা একটি নিরবচ্ছিন্ন বিক্রয় ব্যবস্থার আওতায় আসবে, যা শিল্পটিকে টেকসই করবে। বিশেষ করে যখন বাজারে দুধের সরবরাহ বেশি থাকে, তখন সরকারি এই ক্রয় ব্যবস্থা খামারিদের লোকসানের হাত থেকে রক্ষা করবে।

বাংলাদেশের দুগ্ধশিল্পের কাঙ্ক্ষিত প্রবৃদ্ধি না হওয়ার পেছনে একটি প্রধান অন্তরায় হলো অপরিকল্পিত জাত নির্বাচন। একসময় দেশি গরুর উৎপাদন ক্ষমতা (দৈনিক ১-২ লিটার) কম থাকায় আমরা ইউরোপীয় ‘হলস্টেইন-ফ্রিজিয়ান’ জাতের ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরশীল হয়ে পড়ি। যদিও এই জাতটি দৈনিক ৩০-৪০ লিটার দুধ দিতে সক্ষম, কিন্তু বাংলাদেশের গ্রীষ্মমন্ডলীয় ও আর্দ্র আবহাওয়ার সাথে এটি পুরোপুরি খাপ খাইয়ে নিতে পারেনি। হলস্টেইন-ফ্রিজিয়ান গরুর রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা কম এবং এরা ‘হিট স্ট্রেস’ বা তাপীয় চাপে ভোগে। অন্যদিকে, ‘জার্সি’ ব্রিড আমাদের জন্য অনেক বেশি উপযোগী হতে পারতো। হলস্টেইন-ফ্রিজিয়ানে ফ্যাটের পরিমাণ যেখানে মাত্র ৩.৫%, সেখানে জার্সিতে তা ৫.১%। এছাড়া জার্সি বা দেশীয় সাহিওয়াল ও রেড সিন্ধি জাতগুলো আমাদের আবহাওয়ায় অনেক বেশি সহনশীল।

হলস্টেইন-ফ্রিজিয়ানের আরেকটি বড় সমস্যা হলো বাছুরের অতিরিক্ত ওজন। জন্মকালে বাছুরের ওজন ৩৫-৫০ কেজি পর্যন্ত হওয়ায় প্রসবকালীন জটিলতা ও গাভীর মৃত্যুর ঝুঁকি বেড়ে যায়। অথচ সঠিক ‘ক্রস-ব্রিডিং’ বা সংকরায়ণ নীতির মাধ্যমে আমরা সহজেই দেশীয় পরিবেশে মানানসই উচ্চ উৎপাদনশীল জাত তৈরি করতে পারতাম।

দুগ্ধশিল্পের সংকটের পেছনে খামারি পর্যায়ের কিছু ভুল এবং মধ্যস্বত্বভোগীদের কারসাজিও দায়ী।

অনেক খামারি সরাসরি দুধ দোহন তদারকি করেন না। সুযোগ বুঝে গোয়ালারা আধুনিক যন্ত্র বা কৌশলে দুধ থেকে ক্রিম আলাদা করে নেয়, যা বাজারে বিক্রি করে তারা দৈনিক ১০০০-৩০০০ টাকা অতিরিক্ত লাভ করে। ফলে ভোক্তা কেবল পাতলা ও পুষ্টিহীন দুধ পায়।

এছাড়া অনেক গোয়ালা ওজনে বাড়াতে দুধে পানি মেশায়। দোহনকারীর ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতার অভাব ও নোংরা পরিবেশের কারণে দুধে ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া ছড়িয়ে পড়ে।

দ্রুত দুধ নামানোর জন্য অনেক অসাধু খামারি অক্সিটোসিন ইনজেকশন ব্যবহার করেন। এই রাসায়নিক দুধের মাধ্যমে মানুষের শরীরে প্রবেশ করে দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতি করে এবং গাভীর প্রজনন ক্ষমতা নষ্ট করে দেয়।

বাংলাদেশের দুগ্ধশিল্পের একটি বড় সীমাবদ্ধতা হলো আমরা মূলত তরল দুধ বিক্রির ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু উন্নত বিশ্বে দুগ্ধশিল্প টিকে আছে এর বহুমুখী ব্যবহারের ওপর। যখন বাজারে দুধের সরবরাহ বেড়ে যায়, তখন খামারিরা ন্যায্যমূল্য পান না।

এই সংকট উত্তরণে ‘ভ্যালু অ্যাডেড’ বা দুগ্ধজাত পণ্য যেমন ঘি, পনির, দই, বাটার মিল্ক এবং গুঁড়ো দুধের উৎপাদন বাড়ানো জরুরি। বিশেষ করে স্থানীয় ঐতিহ্যের সাথে মিশে থাকা বগুড়ার দই বা অষ্টগ্রামের পনিরকে যদি বাণিজ্যিক ভিত্তিতে উন্নত মোড়কে বাজারজাত করা যায়, তবে তা কেবল দেশের চাহিদা মেটাবে না, বরং আন্তর্জাতিক বাজারেও রপ্তানিযোগ্য পণ্যে পরিণত হবে। প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পের বিকাশ ঘটলে দুধ ‘পচনশীল পণ্য’ থেকে ‘সম্পদে’ রূপান্তরিত হবে।

দুগ্ধ খামারিদের বর্তমান সময়ের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো গবাদিপশুর খাদ্যের আকাশচুম্বী মূল্য। সয়াবিন মিল, ভুট্টা এবং খৈলের দাম প্রতিনিয়ত বাড়তে থাকায় খামারিদের উৎপাদন খরচ দুধের বিক্রয়মূল্যের চেয়ে বেশি হয়ে যাচ্ছে। এই পরিস্থিতি থেকে বাঁচতে আমাদের ‘টোটাল মিক্সড রেশন’ প্রযুক্তির দিকে নজর দিতে হবে।

এছাড়া মাটির ব্যবহার ছাড়াই অত্যন্ত অল্প জায়গায় এবং স্বল্প খরচে প্রোটিন সমৃদ্ধ ঘাস উৎপাদনের ‘হাইড্রোপনিক’ পদ্ধতি জনপ্রিয় করা যেতে পারে। গবাদিপশুকে পুষ্টিকর কাঁচা ঘাস যেমন নেপিয়ার, জার্মান বা ইপিল ইপিল খাওয়াতে হবে। ঘাসের সংকটকালে ‘সাইলেজ’ (সংরক্ষিত ঘাস) ব্যবহারের পদ্ধতি খামারিদের শেখাতে হবে। খড় খাওয়ানোর ক্ষেত্রে তাতে ইউরিয়া ও চিটাগুড় মিশিয়ে পুষ্টিমান বাড়ানো জরুরি।

রোগবালাই ব্যবস্থাপনা ও জৈব নিরাপত্তা বাংলাদেশের ডেইরি সেক্টরের আরেকটি দুর্বল দিক। আমাদের দেশে গবাদিপশুর মড়ক বা আকস্মিক রোগবালাই খামারিদের নিঃস্ব করে দেয়। বিশেষ করে ‘লাম্পি স্কিন ডিজিজ’ এবং ‘ক্ষুরা রোগ’ এর প্রাদুর্ভাব প্রতিবছর কোটি কোটি টাকার ক্ষতি করছে।3 খামারে বহিরাগতদের প্রবেশ নিয়ন্ত্রণ, নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচি এবং পশুর ঘর জীবাণুমুক্ত রাখার বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিগুলো তৃণমূল পর্যায়ে পৌঁছে দিতে হবে।

একটি সুস্থ গাভী মানেই নিরাপদ দুধ এবং খামারির অর্থনৈতিক নিশ্চয়তা। সরকার দুগ্ধ খাতে কোটি কোটি টাকার ঋণ বরাদ্দ করলেও তার সুফল প্রান্তিক খামারি পর্যন্ত পৌঁছাচ্ছে না। একটি বাছুর পূর্ণবয়স্ক হয়ে দুধ দিতে প্রায় ৩ বছর সময় নেয়। এই দীর্ঘ সময় ধৈর্য না ধরে অনেক খামারি ঋণের টাকা গরুর মোটাতাজাকরণে ব্যয় করেন।

পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে ‘আমুল’ যে সমবায় পদ্ধতির মাধ্যমে বিপ্লব ঘটিয়েছে, বাংলাদেশে তার অভাব প্রকট। আমাদের দেশের সমবায় ব্যবস্থাগুলো শক্তিশালী না হওয়ায় খামারিরা ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। ফলে বড় কোম্পানিগুলো কম দামে দুধ কিনে খামারিদের লোকসানের মুখে ঠেলে দিচ্ছে। সঠিক ‘ভ্যালু চেইন’ না থাকায় খামারিরা ডেইরি ফার্মিং ছেড়ে বিকল্প পেশায় ঝুঁকছেন।

বর্তমান বিশ্বে জলবায়ু পরিবর্তন দুগ্ধশিল্পের জন্য একটি বড় হুমকি। বাংলাদেশে অতিবৃষ্টি, বন্যা এবং অসহনীয় তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে গবাদিপশুর খাদ্য সংকট দেখা দিচ্ছে। তীব্র গরমে গরুর দুধ উৎপাদন ক্ষমতা ২৫-৩০ শতাংশ কমে যায়। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় জলবায়ু-সহনশীল খামার ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি।

বাংলাদেশের গ্রামীণ অর্থনীতিতে দুগ্ধশিল্পের একটি অনন্য দিক হলো নারীর অংশগ্রহণ। বাড়ির আঙিনায় দু-একটি গরু পালন করে অনেক গ্রামীণ নারী আজ অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী। ডেইরি সেক্টরের উন্নয়ন মানেই এই বিশাল নারী জনশক্তির উন্নয়ন। সরকারি পর্যায়ে এই নারীদের আধুনিক প্রশিক্ষণ ও ক্ষুদ্রঋণ সুবিধা দিলে তারা জাতীয় জিডিপিতে আরও বড় অবদান রাখতে পারবে। দুগ্ধশিল্পের সাথে মানুষের জনস্বাস্থ্য সরাসরি জড়িত।

‘ওয়ান হেলথ’ ধারণা অনুযায়ী, পশুর স্বাস্থ্য ভালো না থাকলে মানুষের স্বাস্থ্য নিশ্চিত করা অসম্ভব। বিশেষ করে দুগ্ধখাতে অ্যান্টিবায়োটিকের যথেচ্ছ ব্যবহার একটি বড় উদ্বেগের কারণ। গবাদিপশুর শরীরে উচ্চমাত্রার অ্যান্টিবায়োটিক প্রয়োগ করা হলে তার অবশিষ্টাংশ দুধের মাধ্যমে মানুষের শরীরে প্রবেশ করে, যা অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স তৈরি করছে। আমাদের দায়িত্ব হলো খামারিদের সঠিক ‘উইথড্রয়াল পিরিয়ড’ সম্পর্কে সচেতন করা, যাতে অ্যান্টিবায়োটিক মুক্ত নিরাপদ দুধ নিশ্চিত করা যায়।

আধুনিক বিশ্বে ‘স্মার্ট ডেইরি ফার্মিং’ বা তথ্যপ্রযুক্তি নির্ভর খামার ব্যবস্থা ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছে। বাংলাদেশেও অটোমেটেড মিল্কিং মেশিন, আইওটি সেন্সর এবং স্মার্ট ফিডিং সিস্টেম প্রয়োগ করা সম্ভব। গরুর গলায় সেন্সর লাগিয়ে তার স্বাস্থ্য, খাদ্যাভ্যাস ও প্রজনন সময় ট্র্যাক করলে উৎপাদন বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে।

একটি আধুনিক ডেইরি ফার্ম কেবল দুধের উৎস নয়, এটি নবায়নযোগ্য জ্বালানিরও বড় ভাণ্ডার। গরুর গোবর ও বর্জ্যকে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে বায়োগ্যাস প্ল্যান্টে ব্যবহারের মাধ্যমে খামারের জ্বালানি ও বিদ্যুৎ চাহিদা মেটানো সম্ভব। বায়োগ্যাস উৎপাদনের পর যে ‘স্লারি’ (উচ্ছিষ্ট) থাকে, তা অত্যন্ত উচ্চমানের জৈব সার। রাসায়নিক সারের বিকল্প হিসেবে এটি মাটির গুণাগুণ রক্ষায় অতুলনীয়। অর্থাৎ, দুগ্ধশিল্প কেবল পুষ্টিই দিচ্ছে না, বরং কৃষিতে টেকসই সার সরবরাহ করে একটি ‘চক্রাকার অর্থনীতি’ গড়ে তুলছে।

সবশেষে বলা যায়, বাংলাদেশের দুগ্ধশিল্প কেবল একটি অর্থনৈতিক খাত নয়, এটি একটি জাতির স্বাস্থ্য ও মেধা উন্নয়নের ভিত্তি। একটি পুষ্টিসমৃদ্ধ জাতি গড়ে তুলতে দুধের বিকল্প নেই। দুগ্ধশিল্পের উন্নয়ন মানেই গ্রামীণ অর্থনীতির চাকা সচল হওয়া, কৃষকের ঘরে সচ্ছলতা আসা এবং শিশুদের জন্য নিরাপদ পুষ্টি নিশ্চিত হওয়া। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়সহ অন্যান্য কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর পশুপালন অনুষদ ও ভেটেরিনারি অনুষদ থেকে যে দক্ষ জনবল তৈরি হচ্ছে, তাদের সরাসরি মাঠ পর্যায়ের খামারিদের সাথে যুক্ত করা প্রয়োজন। ল্যাবরেটরি থেকে প্রাপ্ত গবেষণার ফলাফল যেন খামারিদের গোয়ালঘর পর্যন্ত পৌঁছায়, তা নিশ্চিত করতে হবে।

সরকার, বেসরকারি উদ্যোক্তা, কৃষি গবেষক এবং প্রান্তিক খামারি, এই চার পক্ষের সমন্বিত প্রচেষ্টাই পারে বাংলাদেশের দুগ্ধশিল্পের চিত্র বদলে দিতে। “দুগ্ধশিল্পের উন্নতি মানেই কৃষকের সমৃদ্ধি ও জাতীয় অগ্রগতি” এই লক্ষ্যকে সামনে রেখেই আমাদের আগামীর কর্মপরিকল্পনা সাজাতে হবে। সঠিক ব্যবস্থাপনা আর দৃঢ় ইচ্ছাশক্তি থাকলে বাংলাদেশ কেবল দুধে স্বয়ংসম্পূর্ণই হবে না, বরং বিশ্ববাজারে দুগ্ধজাত পণ্য রপ্তানির এক নতুন রোল মডেল হয়ে উঠবে।

ফেসবুকে আমরা

মন্তব্য করুন

guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments

সর্বাাধিক পঠিত নিউজ

Scroll to Top