তারেক আজিজ লিংকন:
ভারতীয় উপমহাদেশের ইতিহাস শুধু রাজার গল্প বা যুদ্ধের কথা নয়। এই মাটিতে এক গভীর আধ্যাত্মিকতা আছে। সূফীবাদ নামের এক ধর্মীয় মতবাদ এখানে আসেনি কেবল ধর্ম হিসেবে, বরং এক প্রশান্ত বাতাসের মতো যা মানুষকে শিখিয়েছে স্রষ্টার সেবা করতে। সূফীবাদ মানে ইসলামের আধ্যাত্মিক দিক। এতে বাইরের আড়ম্বর নেই, বরং হৃদয়ের পবিত্রতা আর স্রষ্টার সাথে সরাসরি সংযোগের ওপর জোর দেয়া হয়।
সূফীবাদের মূল হলো ‘ইশক-এ-হাকিকি’ বা স্রষ্টার প্রতি নিঃস্বার্থ প্রেম। একজন সূফী সাধকের কাছে ধর্ম মানে আত্মার মুক্তি, যা অর্জিত হয় নিজের অহংকে বিসর্জন দিয়ে স্রষ্টার প্রেমে বিলীন হয়ে যাওয়ার মাধ্যমে। সূফীবাদ ভারতীয় উপমহাদেশের মতো বৈচিত্র্যময় সমাজে খুব সহজেই নিজের জায়গা করে নিতে পেরেছে।
ভারতীয় উপমহাদেশে সূফীবাদের আগমনের ইতিহাস বেশ প্রাচীন। আরবের বণিক আর ধর্মপ্রচারকদের হাত ধরে ইসলামী সংস্কৃতির প্রথম ছোঁয়া লাগলেও সূফীবাদের প্রকৃত জোয়ার আসে মূলত দ্বাদশ ও ত্রয়োদশ শতাব্দীর দিকে। মধ্য এশিয়া আর পারস্য থেকে মরমী সাধক, পণ্ডিত আর কবিরা ভারতে আসতে শুরু করেন তখনই সূফীবাদ এক সুসংগঠিত প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করে।
উপমহাদেশে চারটি প্রধান তরীকা বা সিলসিলা বিশেষ প্রভাব বিস্তার করে। এগুলো হলো চিশতীয়া, সোহরাওয়ার্দীয়া, কাদরীয়া এবং নকশবন্দীয়া। প্রতিটি তরীকার সাধনার ধরন আলাদা হলেও সবার লক্ষ্য ছিল এক স্রষ্টাকে পাওয়া। চিশতীয়া তরীকা এই জনপদে সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয়তা পায়। চিশতী সাধকরা রাষ্ট্রীয় সুযোগ সুবিধা বা রাজদরবারের বিলাসিতা বর্জন করে জনগণের পর্ণকুটিরে থাকতেন।
ভারতবর্ষে সূফীবাদের কথা বললে যার নাম সবার আগে স্মরণে আসে তিনি হলেন খাজা মঈনুদ্দিন চিশতী। আজমীরে বসতি স্থাপন করে তিনি যে মানবিক সেবার দুয়ার খুলেছিলেন তার কারণে তিনি আজও জনমানসে ‘গরীব নওয়াজ’ বা দরিদ্রের বন্ধু হিসেবে পরিচিত। তাঁর উত্তরসূরি কুতুবউদ্দিন বখতিয়ার কাকী দিল্লির আধ্যাত্মিক পরিবেশকে সমৃদ্ধ করেছিলেন।
সূফী সাধকদের প্রতিষ্ঠিত ‘খানকাহ’ বা আধ্যাত্মিক কেন্দ্রগুলো ছিল মধ্যযুগীয় সমাজের এক একটি বিকল্প কল্যাণ প্রতিষ্ঠান। এই খানকাহগুলোর অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিল ‘লঙ্গরখানা’ বা উন্মুক্ত খাবার ঘর। জাতি ধর্ম নির্বিশেষে যে কেউ সেখানে অন্ন আর আশ্রয় পেত। উচ্চবর্ণের আধিপত্য আর সামাজিক বৈষম্যের সেই যুগে লঙ্গরখানার এই সাম্য ছিল এক বৈপ্লবিক ব্যাপার।
ভারতীয় উপমহাদেশের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষায় সূফীদের অবদান অতুলনীয়। মুঘল সম্রাট আকবরের সময় যে ‘সুলহ-ই-কুল’ বা সর্বজনীন শান্তির নীতি গ্রহণ করা হয়েছিল তার নেপথ্যে ছিল সূফী সাধকদের উদার দর্শন। তারা বিশ্বাস করতেন স্রষ্টা এক এবং অদ্বিতীয় আর মানুষ ভিন্ন ভিন্ন পথে সেই একই সত্যের সন্ধান করছে।
সূফীবাদ আমাদের শেখায় যে ঘৃণা দিয়ে নয় বরং ক্ষমা ও সহমর্মিতা দিয়েই অন্ধকার দূর করা সম্ভব। আধুনিক মানুষের আধ্যাত্মিক শূন্যতা পূরণে সূফী দর্শন এক অসীম প্রশান্তির বারতা নিয়ে আসে। বিভাজনের রাজনীতির বিপরীতে সূফীদের সেই বহুত্ববাদী সমাজের আদর্শই হতে পারে বিশ্বশান্তির মূলমন্ত্র। সূফীবাদের এই শাশ্বত যাত্রা আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে আত্মার মুক্তি কেবল একাকী প্রার্থনায় নয় বরং সমগ্র সৃষ্টিজগতের কল্যাণের মধ্যেই নিহিত। সূফীদের সেই উদার নৈতিকতা আর মানবিক মূল্যবোধই পারে আজকের পৃথিবীকে এক শান্তিময় বাসযোগ্য স্থানে পরিণত করতে। উপমহাদেশের এই মাটিতে সূফীবাদের সেই প্রেমময় পদধ্বনি যেন আমাদের হৃদয়ে চিরকাল প্রতিধ্বনিত হয়। ভালোবাসাই হোক আমাদের একমাত্র পরিচয়।