জাহেদুল ইসলাম আল রাইয়ান:
আলেম এই শব্দটি একসময় ছিল নেতৃত্ব, প্রজ্ঞা, আত্মমর্যাদা ও দানের প্রতীক। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, মুসলিম সমাজে আলেমরা কখনোই কেবল ধর্মীয় অনুষঙ্গের সীমায় আবদ্ধ ছিলেন না, বরং তারা ছিলেন জ্ঞানের ধারক, অর্থনৈতিক শক্তির উৎস, সমাজসংস্কারক এবং মানবকল্যাণের অন্যতম অগ্রদূত। কিন্তু সময়ের বিবর্তনে এই পরিচয়ের ভেতরে এক ধরনের পরিবর্তন স্পষ্ট হয়ে উঠেছে বিশেষত বাংলাদেশসহ উপমহাদেশীয় বাস্তবতায়।
আজকের পৃথিবীতে, বিশেষ করে আরব সমাজে, বহু আলেম এখনো জ্ঞানচর্চার পাশাপাশি অর্থনৈতিক ও সামাজিক শক্তির অধিকারী। তারা উদ্যোক্তা, দাতা, সংগঠক যেখানে প্রতিযোগিতা থাকে কে কত বেশি মানুষের উপকার করতে পারে। তারা মসজিদ নির্মাণ করেন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন, শিক্ষার্থীদের ব্যয় বহন করেন, অনেক ক্ষেত্রেই তারা নিজস্ব সম্পদ দিয়ে দাওয়াহর পরিসর বিস্তৃত করেন। সেখানে আলেম হওয়া মানে কেবল জ্ঞানের অধিকারী হওয়া নয়, বরং তা এক ধরনের নেতৃত্ব, সক্ষমতা এবং দায়িত্ববোধের প্রতীক।
অন্যদিকে বাংলাদেশের বাস্তবতা ভিন্ন এক চিত্র তুলে ধরে। এখানে বহু আলেম মসজিদ, মাদ্রাসা এবং সাধারণ মানুষের দান-সদকার ওপর নির্ভরশীল জীবনযাপন করেন। এটি কোনো ব্যক্তিগত ব্যর্থতা নয়, বরং একটি দীর্ঘদিনের কাঠামোগত বাস্তবতা। কিন্তু এই নির্ভরতা ধীরে ধীরে এমন এক মানসিক অবস্থার জন্ম দিয়েছে, যেখানে দাওয়াহর শক্তি থাকা সত্ত্বেও আলেমদের অর্থনৈতিক স্বাধীনতা সীমিত হয়ে পড়ছে। ফলে তারা সমাজে প্রভাব বিস্তার করলেও বৃহত্তর নেতৃত্বে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে পারছেন না।
ইসলামের স্বর্ণালী ইতিহাস এই বাস্তবতার সম্পূর্ণ বিপরীত এক দৃষ্টান্ত তুলে ধরে। ইমাম আবু হানিফা রহ. ছিলেন একজন সফল বণিক, তিনি তাঁর ব্যবসার আয় থেকে শিক্ষার্থীদের ব্যয় বহন করতেন এবং কারও কাছে হাত পাতার প্রয়োজন অনুভব করতেন না। তাঁর একটি বিখ্যাত বাণী ‘যে ব্যক্তি নিজের জীবিকা নিশ্চিত করে না, সে জ্ঞানের মর্যাদা রক্ষা করতে পারে না’ আজও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক।
ইমাম মালিক রহ. এর জীবনে আমরা দেখি আত্মমর্যাদা ও স্বাধীনতার এক অনন্য দৃষ্টান্ত। তিনি জ্ঞানকে কখনো দুনিয়াবি স্বার্থের কাছে বিকিয়ে দেননি। জ্ঞান ছিল তাঁর কাছে আমানত, আর সেই আমানতের মর্যাদা রক্ষায় তিনি আপসহীন ছিলেন।
ইমাম শাফেয়ী রহ. বলেছেন ‘জ্ঞান মর্যাদা এনে দেয়, কিন্তু সেই মর্যাদা রক্ষা করতে হলে মানুষকে আত্মনির্ভর হতে হয়।’ তাঁর জীবনেও আমরা দেখি পরিশ্রম, আত্মত্যাগ এবং স্বাধীনতার সমন্বয়।
ইমাম আহমদ ইবন হাম্বল রহ. এর দৃঢ়তা ছিল এমন যে, তিনি দুনিয়াবি চাপের কাছে নত হননি, বরং সত্যের ওপর অবিচল থেকেছেন। তাঁর জীবন দেখায় আত্মনির্ভরতা কেবল অর্থনৈতিক নয়, এটি মানসিক ও নৈতিক শক্তিরও ভিত্তি।
ইতিহাসে ইবনে সাআদ রহ. এর মতো ব্যক্তিত্বদের পাওয়া যায়, যারা বাণিজ্যে সফল হয়ে সেই সম্পদ মানুষের কল্যাণে ব্যয় করেছেন। তাদের প্রতিষ্ঠিত উদ্যোগ দীর্ঘদিন ধরে মানুষের উপকারে এসেছে। একইভাবে বহু তাবেঈ ও আলেম ছিলেন, যারা কৃষি, ব্যবসা কিংবা কারুশিল্পের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন কিন্তু কখনোই তাদের জ্ঞানচর্চা ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি, বরং তা আরও সমৃদ্ধ হয়েছে।
রাসূলুল্লাহ দ. এর শিক্ষা ছিল স্পষ্ট ‘উপরের হাত নিচের হাতের চেয়ে উত্তম।’ এই একটি বাণীই আলেম সমাজের জন্য দিকনির্দেশনা হিসেবে যথেষ্ট। দাতা হওয়া, সৃষ্টিশীল হওয়া, সমাজকে দেওয়ার ক্ষমতা অর্জন করা এগুলোই ইসলামের মৌলিক চেতনার অংশ।
সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে দাওয়াহর ক্ষেত্রও বিস্তৃত হয়েছে। আজ দাওয়াহ কেবল মসজিদের মিম্বরে সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি ছড়িয়ে পড়েছে লেখালেখি, গণমাধ্যম, শিক্ষা, প্রযুক্তি এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে। যে আলেম এই বহুমাত্রিক বাস্তবতাকে উপলব্ধি করতে পারবেন, তিনিই হবেন আগামীর দিশারী।
বাংলাদেশের আলেম সমাজের সামনে আজ একটি ঐতিহাসিক পরিবর্তন জরুরী নির্ভরতার গণ্ডি অতিক্রম করে আত্মনির্ভরতা, উদ্যোগ এবং নেতৃত্বের পথে অগ্রসর হওয়ার। মাদ্রাসা ও মসজিদের গণ্ডি অতিক্রম করে তাদের প্রবেশ করতে হবে সমাজের বৃহত্তর পরিসরে ব্যবসা, সামাজিক উদ্যোগ, জ্ঞানভিত্তিক প্রতিষ্ঠান, গবেষণা ও মিডিয়ার জগতে।
এটি কেবল অর্থনৈতিক পরিবর্তনের প্রশ্ন নয়, এটি মানসিকতার পরিবর্তনের প্রশ্ন। যে আলেম নিজে দাঁড়াতে পারে, সে-ই অন্যকে দাঁড়াতে শেখাতে পারে। যে আলেম দিতে পারে, সে-ই সমাজকে পথ দেখাতে পারে।
ইতিহাসের এক অমোঘ সত্য হলো
আলেমরা যখন দাতা হয়েছেন, তখন সভ্যতা এগিয়েছে, আর যখন তারা নির্ভরতায় আবদ্ধ হয়েছেন, তখন অগ্রগতির গতি থেমে গেছে।
সময়ের আহ্বান স্পষ্ট আলেম মানে কেবল মিম্বরের কণ্ঠ নয়, বরং সমাজের চালিকাশক্তি,
আলেম মানে কেবল জ্ঞানের বাহক নয়, বরং নেতৃত্বের প্রতীক,
আলেম মানে কেবল গ্রহণকারী নয়, বরং দানশীল এক আলোকবর্তিকা।
এই চেতনার পুনর্জাগরণই পারে আলেম সমাজকে আবারও সেই উচ্চতায় পৌঁছে দিতে যেখানে তারা কেবল অনুসরণীয় নয়, বরং পথপ্রদর্শক।
লেখক, কলামিস্ট ও শিক্ষার্থী, আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়, কায়রো, মিশর