১৬ই এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ৩রা বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ | ২৮শে শাওয়াল, ১৪৪৭ হিজরি

সৃষ্টির স্পন্দনে ঐশী মমতা, ইসলামে প্রাণিকুলের অধিকার ও শাশ্বত দায়বদ্ধতা

মোহাম্মদ জিয়া উল্লাহ রিফায়ি, শিক্ষার্থী, আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়,কায়রো,মিশর:

বিশ্বচরাচরের প্রতিটি অণু-পরমাণু মহান স্রষ্টার সুনিপুণ কারুকাজ। তাঁর অসীম সৃষ্টিসম্ভারে মানুষ যেমন শ্রেষ্ঠত্বের মুকুট পরেছে, তেমনি বনের পশুপাখি আর বিচরণশীল প্রাণীকুলও সেই একই সৃজনী সত্তার মহিমায় উদ্ভাসিত। ইসলাম কেবল মানুষের জন্য এক নির্দেশিকা নয়, বরং এটি সমগ্র মহাবিশ্বের প্রতিটি সংবেদনশীল প্রাণের সুরক্ষা কবজ। অবলা প্রাণীর অব্যক্ত যাতনা অনুধাবন করা এবং তাদের প্রতি করুণার্দ্র হওয়া আধ্যাত্মিক পূর্ণতার এক অনন্য সোপান।

পবিত্র কুরআনে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা প্রাণীকুলকে নিছক ব্যবহারের বস্তু হিসেবে নয়, বরং মানুষের মতোই এক একটি স্বতন্ত্র ও সুশৃঙ্খল ‘উম্মত’ বা জাতি হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছেন।
মহান আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন, “আর যত প্রকার প্রাণী পৃথিবীতে বিচরণশীল রয়েছে এবং যত প্রকার পাখী দু’ ডানাযোগে উড়ে বেড়ায় তারা সবাই তোমাদের মতই একেকটি জাতি।”(সূরা আনআম ৩৮)

এই আয়াত আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়, নীল আকাশের ডানা মেলা পাখি কিংবা মাটির বুকে তৃষ্ণার্ত চাতক প্রত্যেকেই মহান রবের তাসবিহ পাঠে মগ্ন এবং তারা আমাদের মতোই পরম মমতার দাবিদার।

ঐশী ক্যানভাসে প্রাণের আল্পনা,
পবিত্র কুরআনের ১১৪টি সুরার সুবিশাল অরণ্যে মহান আল্লাহ তাআলা কিছু সুরার নামকরণ করেছেন প্রাণীকুলের নামে। এটি যেন সৃষ্টির ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র স্পন্দনকেও স্রষ্টার পক্ষ থেকে এক রাজকীয় স্বীকৃতি প্রদানের নামান্তর।

সেই চিরন্তন ও ধ্রুপদী নামগুলো হলো,
★ সূরা আল-বাকারাহ (গাভী)
★ সূরা আল-আনআম (গৃহপালিত পশু)
★ সূরা আন-নাহল (মৌমাছি)
★ সূরা আন-নামল (পিপীলিকা)
★ সূরা আল-আনকাবুত (মাকড়সা)
★ সূরা আল-ফিল (হাতি)

পবিত্র কুরআনের এই মহিমান্বিত তলায়নের প্রায় দুই শতাধিক আয়াতে ৩১টিরও বেশি প্রজাতির প্রাণের ছন্দময় গুঞ্জন শ্রুত হয়। নীল আকাশের ডানা মেলা ‘হুদহুদ’ থেকে শুরু করে সাগরের অতল গহীনের মৎস্য সবারই উপস্থিতি সেখানে সমান মহিমায় ভাস্বর। এটিই প্রমাণ করে যে, বিশ্বচরাচরের এই বিশাল ক্যানভাসে মানুষের পাশাপাশি প্রতিটি প্রাণও স্রষ্টার এক একটি অনন্য শিল্পকর্ম।

হাদিসের দর্পণে মানবিকতার প্রতিচ্ছবি, বিশিষ্ট সাহাবী হযরত আবূ হুরায়রা রা. সুত্রে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণিত, এক পাপাচারিণী নারী কোন এক গরমের দিনে একটি কুকুরকে একটি কুপের পাশে চক্কর দিতে দেখতে পেল, সেটি পিপাসায় তার জিভ বের করে হাঁপাচ্ছিলো। তখন সে তার মোজা দিয়ে তার জন্য পানি তুলে আনল এবং পান করাল। ফলে আল্লাহ তাকে ক্ষমা করে দেন। (মুসলিম শরীফ)

তপ্ত মরুচরে এক তৃষ্ণার্ত প্রাণের অব্যক্ত যাতনা জাগিয়ে তুলেছিল অন্ধকার পথের যাত্রী এক নারীর সুপ্ত মানবিকতা। নিজের মোজাটিকেই ‘জীবন সঞ্জীবনী’ সুধাপাত্রে পরিণত করে এক তৃষ্ণার্ত কুকুরকে জীবনদান করেছিলেন তিনি। তার এই নিঃস্বার্থ করুণা আরশের অধিপতিকে এতটাই সিক্ত করেছিল যে, ক্ষুদ্র এক সৃষ্টির প্রতি মমতার বিনিময়ে আল্লাহ তার জীবনের সব কালিমা মুছে পরম ক্ষমার চাদরে আবৃত করে নিলেন। সৃষ্টির প্রতি এই অবারিত মায়াই স্রষ্টার সান্নিধ্য লাভের পরম সোপান।

যেখানে এক বিন্দু জল এক বিপথগামীকে ঐশী ক্ষমার শীতল ছায়ায় পৌঁছে দেয়, সেখানে সৃষ্টির প্রতি যৎসামান্য নিষ্ঠুরতাও একজন মানুষকে টেনে নিতে পারে নরকাগ্নির অতল গহ্বরে।

মানবতার মুক্তিদূত রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পবিত্র জবানীতে বর্ণিত সেই সতর্কবার্তা আমাদের হৃদকম্পন জাগিয়ে দেয়। আবদুল্লাহ রা. থেকে বর্ণিত হাদীসের সেই অমোঘ বাণী “এক স্ত্রীলোককে একটি বিড়ালের কারণে আযাব দেয়া হয় যে, সে বিড়ালটিকে বেঁধে রেখেছিল, অবশেষে সেটি মারা গেল। এ কারণে সে জাহান্নামে গেল। যে স্ত্রীলোকটি বিড়ালটিকে আটকে রেখেছে, নিজেও পানাহার করায়নি আর সেটিকে সে ছেড়েও দেয়নি, যাতে সে যমীনের পোকা-মাকড় খেয়ে বাঁচতে পারে।(মুসলিম শরীফ)

অন্ধকার এক প্রকোষ্ঠে একটি অবলা মার্জারের নিঃশব্দ দীর্ঘশ্বাস আর ক্ষুধার্ত ছটফটানি আসমানের মালিক সইতে পারেননি। নিছক অবহেলা নয়, বরং একটি স্বাধীন প্রাণকে শৃঙ্খলিত করে তাকে প্রকৃতির অবারিত রিজিক থেকে বঞ্চিত করার এই পাষাণবৃত্তি সেই নারীর যাবতীয় প্রার্থনাকে ধুলিসাৎ করে দিয়েছে।

সৃষ্টির প্রতি ইসলামের এই মমত্ববোধ কেবল তাত্ত্বিক কোনো নীতিমালায় সীমাবদ্ধ নয়, বরং তা রহমাতুল্লিল আলামীনের জীবন বসন্তের এক একটি পুষ্পিত অধ্যায়। একদা এক স্নিগ্ধ দুপুরে নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক আনসারী সাহাবীর খেজুর বাগানে প্রবেশ করে হঠাৎ এক করুণ দৃশ্যের মুখোমুখি হন। সেখানে একাকী দাঁড়িয়ে থাকা একটি অবলা উট নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম’কে দেখা মাত্রই রুদ্ধ আবেগে কাঁদতে শুরু করল। বিজন সেই বাগানে উটটির দু’চোখ বেয়ে অবিরল অশ্রুধারা গড়িয়ে পড়ছিল যেন দীর্ঘদিনের সঞ্চিত কোনো অব্যক্ত যাতনা সে আজ তার প্রিয়তম আশ্রয়কে পেয়ে উগরে দিচ্ছে।

বোবা কান্নার সেই হাহাকার দয়ার নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর হৃদয়কে ব্যথিত করল। তিনি ধীরলয়ে উটটির কাছে এগিয়ে গেলেন এবং পরম মমতায় তার মস্তকে ও কপালে হাত বুলিয়ে আদর করলেন। নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সেই মায়াবী পরশে মহাবিশ্বের সবটুকু প্রশান্তি যেন অবলা প্রাণীটির শরীরে নেমে এল, মুহূর্তেই তার অশ্রু শুকালো, প্রশান্ত হলো তার তপ্ত বুক। অতঃপর নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামে সেই আনসারী যুবককে উদ্দেশ্য করে এক অমর হুশিয়ারি উচ্চারণ করলেন, যা কিয়ামত পর্যন্ত প্রতিটি প্রাণীর ‘মুক্তির সনদ’ হয়ে থাকবে।

“আল্লাহ যে তোমাকে এই নিরীহ প্রাণীটির মালিক বানালেন, এর অধিকারের ব্যাপারে তুমি কি আল্লাহকে ভয় করো না? উটটি আমার কাছে অভিযোগ করেছে, তুমি একে ক্ষুধার্ত রাখো এবং একে কষ্ট দাও।”

এই চিরন্তন আখ্যান আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় যে, পশুর পিঠে কেবল বোঝা চাপানোই মালিকের কাজ নয়, বরং তাদের তৃষ্ণার ভাষা এবং ক্ষুধার আর্তি বোঝাও আধ্যাত্মিকতার এক অপরিহার্য দাবি। সৃষ্টির প্রতি এই যে ঐশী দায়বদ্ধতা এটিই ইসলামকে অনন্য এক মানবিক ধর্মের চূড়ান্ত রূপ দান করেছে।

ইসলামের নক্ষত্রখচিত ইতিহাসে এমন এক মহামানবের নাম পাওয়া যায়, যাঁর প্রকৃত পরিচয় কালক্রমে ঢাকা পড়ে গেছে তাঁর অনুপম সৃষ্টিপ্রেমের স্নিগ্ধ আড়ালে। তিনি হযরত আব্দুর রহমান রা. কিন্তু বিশ্বচরাচর তাঁকে চেনে ‘আবু হুরায়রা রা.’ বা ‘বিড়াল ছানার পিতা’ হিসেবে।

মরুর ধূসর প্রেক্ষাপটে নিজের চাদরের আস্তিনে একটি সিক্ত ও অসহায় বিড়াল ছানাকে আশ্রয় দিয়ে তিনি আমাদের এই ধ্রুব সত্য শিখিয়েছেন যে সৃষ্টির সেবা কেবল যান্ত্রিক দায়িত্ব নয়, বরং এটি হৃদয়ের এক পরম প্রশান্তি। স্বয়ং রাহমাতুল্লিল আলামীন সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন তাঁকে ‘আবু হুরায়রা’ নামে সম্বোধন করলেন, সেই পবিত্র ডাকের মধ্য দিয়ে যেন প্রাণিকুলের প্রতি মানুষের এই গভীর আত্মিক বন্ধনই লাভ করল এক শাশ্বত ঐশী স্বীকৃতি। এটি কেবল একটি নাম নয়, বরং পৃথিবীর প্রতিটি অবলা প্রাণের প্রতি ইসলামের সস্নেহ পরশের এক চিরস্থায়ী উপাখ্যান।

যান্ত্রিক সভ্যতা ও বিপন্ন প্রাণের হাহাকার কালের বিবর্তনে আমরা আজ এক যান্ত্রিক সভ্যতার শিখরে দাঁড়িয়ে আছি, যেখানে গগণচুম্বী অট্টালিকা আর কৃত্রিম জৌলুস আমাদের দৃষ্টিকে ঝাপসা করে দিয়েছে। যে ধরণীতে একদা সৃষ্টির প্রতি মমতা ছিল মুমিনের ভূষণ, আজ সেখানে স্বার্থের দ্বন্দ্বে অবলা প্রাণীদের অস্তিত্ব সংকটাপন্ন। বর্তমান যুগে পশুপাখির প্রতি আমাদের চরম ঔদাসীন্য আর নিষ্ঠুরতা যেন এক করুণ ট্র্যাজেডিতে রূপ নিয়েছে।

প্রকৃতির অবারিত শ্যামলিমা ধ্বংস করে আমরা যখন ইট-পাথরের জঙ্গল গড়ছি, তখন নীড়হারা পাখির বিলাপ আমাদের কানে পৌঁছায় না। আধুনিক বিনোদনের নামে কিংবা নিছক খেয়ালের বশবর্তী হয়ে অবলা প্রাণীর ওপর যে অমানুষিক নির্যাতন চালানো হয়, তা আমাদের মানবিকতার দেউলিয়াত্বকেই প্রকাশ করে। ডানা মেলা পাখির কলকাকলি কিংবা রাজপথের পাশে পড়ে থাকা আর্ত প্রাণীটির অব্যক্ত যাতনা অনুধাবন করার মতো কোমল হৃদয় আজ যেন দুর্লভ হয়ে উঠেছে।

আমরা ভুলে গেছি, পঙ্গপালের মতো যান্ত্রিক সুখের পেছনে ছুটতে গিয়ে আমরা সেই ঐশী দায়বদ্ধতা থেকে বিচ্যুত হয়ে পড়ছি, যা আমাদের সৃষ্টির সেবক হিসেবে নিযুক্ত করেছিল।আমাদের মনে রাখা প্রয়োজন, যে সমাজ প্রাণীর অশ্রুর মূল্য দিতে জানে না, সেই সমাজ শেষ পর্যন্ত নিজের মনুষ্যত্বকেও হারিয়ে ফেলে। সৃষ্টির এই বিশাল ক্যানভাসে প্রতিটি প্রাণের স্পন্দন মহান রবের এক একটি অনুপম শিল্পকর্ম, আর সেই শিল্পকে অবজ্ঞা করা মানেই খোদ স্রষ্টার সৃজনী সত্তাকে অপমান করা।

পরিশেষে বলা যায়, সৃষ্টির এই সুবিশাল ক্যানভাসে মানুষ আর প্রাণী একে অপরের বিচ্ছিন্ন কোনো সত্তা নয়, বরং একই মহাজাগতিক সুরের অবিচ্ছেদ্য মূর্ছনা। প্রাণীর প্রতি সহানুভূতি প্রদর্শন কোনো লৌকিক দয়া নয়, বরং এটি আত্মিক পবিত্রতা ও ঈমানের এক পরম পরীক্ষা। যখন কোনো মুমিন একটি আহত প্রাণের ক্ষতে স্নেহের প্রলেপ দেয়, কিংবা তৃষ্ণার্ত চাতককে এক অঞ্জলি জল পান করায়, তখন সেই নিঃশব্দ সেবার মধ্য দিয়ে আরশের অধিপতির সন্তুষ্টির দুয়ার খুলে যায়।

আসুন, আমরা আমাদের যান্ত্রিক রুচি ও পাষাণ হৃদয়ে ইসলামের এই শৈল্পিক মানবিকতা পুনরায় জাগ্রত করি। ধরণীর প্রতিটি স্পন্দনের প্রতি দয়াশীল হওয়াই হোক আমাদের প্রকৃত মনুষ্যত্ব ও আধ্যাত্মিকতার শ্রেষ্ঠ পরিচয়।

আমাদের মনে রাখা প্রয়োজন, সৃষ্টির সেবাতেই লুকিয়ে আছে স্রষ্টার প্রকৃত সান্নিধ্য যেখানে ক্ষুদ্র এক মার্জার কিংবা তৃষ্ণার্ত উটের কান্না থামানোর মাঝেই নিহিত রয়েছে পরকালীন অনন্ত মুক্তির গূঢ় রহস্য। পৃথিবীর প্রতিটি সংবেদনশীল প্রাণের প্রতি আমাদের এই অবারিত মায়াই হোক আগামীর এক বাসযোগ্য ও প্রেমময় পৃথিবীর স্বপ্নবীজ।

ফেসবুকে আমরা

মন্তব্য করুন

guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments

সর্বাাধিক পঠিত নিউজ

Scroll to Top