২০২৬ বিশ্বকাপে VAR বিতর্ক এবং সমর্থকদের সফট কর্নার

মিজানুর রহমান:

রাত জেগে খেলা দেখা বাংলাদেশের কোটি দর্শকের কাছে ফুটবল শুধু একটি খেলা নয়, একধরনের আবেগ। ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপ শুরু হওয়ার পর থেকে সেই আবেগের পাশাপাশি জন্ম নিয়েছে একটি প্রশ্ন-ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারি বা VAR আসলে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করছে, নাকি নতুন এক ধরনের অবিশ্বাসের জন্ম দিচ্ছে? সামাজিক মাধ্যমে বাংলাদেশি সমর্থকদের মন্তব্যের স্রোতে বারবার উঠে এসেছে একটি অভিযোগ-প্রযুক্তি যতই নিখুঁত হোক, শেষ সিদ্ধান্তটা যেহেতু মানুষই নেয়, সেখানে বড় দল আর তারকা খেলোয়াড়দের প্রতি একধরনের নরম দৃষ্টিভঙ্গি বা ‘সফট কর্নার’ কাজ করে।

যন্ত্র নিখুঁত, তবু বিতর্ক থামে না কেন?
এবারের বিশ্বকাপে অফসাইড শনাক্তের প্রযুক্তি আগের চেয়ে বহুগুণ নিখুঁত। সেমি-অটোমেটেড অফসাইড প্রযুক্তির সঙ্গে এবার যুক্ত হয়েছে ফিফার ‘কানেক্টেড বল’ প্রযুক্তি-ম্যাচ বলের ভেতরে বসানো IMU সেন্সরের মাধ্যমে মিলিমিটার নির্ভুলতায় বলের স্পর্শ শনাক্ত করা যায়। পর্তুগাল-ক্রোয়েশিয়া ম্যাচে এই প্রযুক্তির সাহায্যেই নির্ধারিত হয়েছিল বলের সামান্যতম স্পর্শ কীভাবে অফসাইড লাইন বদলে দিয়েছিল।
কিন্তু দর্শকের প্রকৃত ক্ষোভের জায়গা অফসাইড নয়-পেনাল্টি আর হ্যান্ডবলের মতো বিষয়ভিত্তিক সিদ্ধান্ত। অফসাইড একটি তথ্যনির্ভর (factual) সিদ্ধান্ত, যা যন্ত্র মেপে জানিয়ে দেয়। কিন্তু হাতে বল লাগা ‘শাস্তিযোগ্য হ্যান্ডবল’ কিনা, কিংবা কোনো ট্যাকল ফাউল কিনা-তা এখনো মাঠের রেফারি ও ভিএআর কক্ষে বসা কর্মকর্তার ব্যাখ্যার ওপর নির্ভর করে। নিয়ম অনুযায়ী, VAR তখনই হস্তক্ষেপ করে যখন মাঠের সিদ্ধান্তে ‘স্পষ্ট ও সুনির্দিষ্ট ভুল’ থাকে-আর ঠিক এই জায়গাতেই তৈরি হয় সবচেয়ে বেশি বিতর্ক।

গতকালের উদাহরণ: স্পেন-বেলজিয়াম এবং রদ্রির হাত:
বৃহস্পতিবার লস অ্যাঞ্জেলেসে অনুষ্ঠিত কোয়ার্টার-ফাইনালে স্পেন ২-১ গোলে বেলজিয়ামকে হারিয়ে সেমিফাইনালে ওঠে। কিন্তু ম্যাচ শেষেও আলোচনার কেন্দ্রে থেকে যায় একটি হ্যান্ডবল প্রসঙ্গ। স্পেনের রদ্রির হাতে বল লাগার পর বেলজিয়ামের জোরালো আবেদন সরাসরি নাকচ করে দেন রেফারি মাইকেল অলিভার, আর VAR কক্ষ থেকেও কোনো পর্যালোচনার সুপারিশ আসেনি। মাঠ ও সামাজিক মাধ্যমে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া ছিল তীব্র।
তবে খেলার আইন বলছে ভিন্ন কথা। আন্তর্জাতিক ফুটবল নিয়মপ্রণয়ন সংস্থা IFAB-এর হ্যান্ডবল আইন অনুযায়ী, সতীর্থের মাথা বা শরীর থেকে বল সরাসরি হাতে বা বাহুতে লাগলে তা শাস্তিযোগ্য হ্যান্ডবল হিসেবে গণ্য হয় না। এই ঘটনায় স্পেনের আইমেরিক লাপোর্তের হেড থেকে বল রদ্রির হাতে লাগে; বলের দিক হঠাৎ বদলে যাওয়ায় রদ্রির হাত সরিয়ে নেওয়ার মতো সময়ও ছিল না, আর তার হাত ছিল স্বাভাবিক অবস্থানে। রেফারিং বিশ্লেষকদের মতে, নিয়মের চুলচেরা বিচারে সিদ্ধান্তটি সঠিক ছিল-তবু আবেগের জায়গা থেকে বেলজিয়ামের সমর্থকদের কাছে তা মেনে নেওয়া কঠিন হয়েছে। এখানেই স্পষ্ট হয়, নিয়ম আর হৃদয়ের হিসাব সবসময় মেলে না।

টুর্নামেন্ট জুড়ে বিতর্কিত মুহূর্তগুলো:

এই বিশ্বকাপে এমন ঘটনার তালিকা দীর্ঘ। আর্জেন্টিনা-মিসর ম্যাচে মোস্তফা জিকোর একটি গোল বাতিল হয় প্রায় বিশ সেকেন্ড আগের এক শার্ট-টানার অভিযোগে, যা নিয়ে মিসরের কোচ হোসাম হাসান সরাসরি অভিযোগ তোলেন যে ফিফা লিওনেল মেসি ও আর্জেন্টিনাকে সুবিধা দিচ্ছে। ইরান-মিসর ম্যাচে শেষ মুহূর্তের একটি গোল মাত্র এক মিলিমিটার ব্যবধানে অফসাইডের কারণে বাতিল হয়। ঘানা-ইংল্যান্ড ম্যাচে বক্সের ভেতরের স্পষ্ট ট্যাকলের পরও পেনাল্টি না পেয়ে ঘানার কোচ কার্লোস কুইরোজ ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, VAR যেন ‘কফি খেতে গিয়েছিল’। জার্মানি-প্যারাগুয়ে ম্যাচে অতিরিক্ত সময়ে একটি গোল বাতিল হওয়ার পর জার্মান কোচ ইউলিয়ান নাগেলসমান সিদ্ধান্তকে ‘তামাশা’ বলে আখ্যা দেন-আর জার্মানি শেষ পর্যন্ত টাইব্রেকারে বিদায় নেয়।
প্রতিটি ঘটনায় অভিন্ন একটি সুর শোনা যায়-ধারাবাহিকতার অভাব। একই ধরনের ট্যাকল কোথাও লাল কার্ড, কোথাও কিছুই না। আলজেরিয়ার বিপক্ষে মেসির একটি ট্যাকল কোনো কার্ডই পায়নি, অথচ প্রায় একই ধরনের ঘটনায় অন্য টুর্নামেন্টে খেলোয়াড়েরা সরাসরি লাল কার্ড দেখেছেন। এই অসামঞ্জস্যই বড় দলগুলোর প্রতি পক্ষপাতের অভিযোগকে জোরালো করে তুলছে, যদিও প্রতিটি সিদ্ধান্তের পেছনেই প্রযুক্তিগত ও আইনি ব্যাখ্যা হাজির করা হয়েছে।

ফিফার সাম্প্রতিক পদক্ষেপ:

ক্রমবর্ধমান সমালোচনার মুখে ফিফা নীরব থাকেনি। কোয়ার্টার-ফাইনাল থেকে চালু হয়েছে সংশোধিত প্রোটোকল। আগে ডালাসের কেন্দ্রীয় ভিডিও অপারেশন রুম থেকে সব ম্যাচ পরিচালিত হতো, এখন প্রতিটি স্টেডিয়ামেই সরাসরি একজন প্রধান এবং একজন রিজার্ভ VAR কর্মকর্তা উপস্থিত থাকছেন, যাতে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হলেও কোনো বিলম্ব ছাড়াই সিদ্ধান্ত নেওয়া যায়। ফিফার প্রধান রেফারিং কর্মকর্তা পিয়েরলুইজি কলিনা বলেছেন, গঠনমূলক সমালোচনা ফুটবলের চিরন্তন অংশ হলেও ভিত্তিহীন অভিযোগ রেফারি ও তাঁদের পরিবারের জন্য নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি করতে পারে, এবং ফিফার রেফারিং কোনো পক্ষের প্রভাবে পরিচালিত হয় না বলে তিনি স্পষ্ট বার্তা দেন।

বাংলাদেশের দর্শকের হৃদয়ে যে সফট কর্নার:

বাংলাদেশ নিজে বিশ্বকাপে না খেললেও আর্জেন্টিনা, ব্রাজিল, স্পেন কিংবা জার্মানির জার্সি-পতাকা এখানকার অলিগলিতেও ওড়ে। তাই প্রিয় দলের বিপক্ষে যে কোনো বিতর্কিত সিদ্ধান্তই এখানকার দর্শকের কাছে ব্যক্তিগত আঘাতের মতো অনুভূত হয়। সামাজিক মাধ্যমের মন্তব্যে দুটি স্পষ্ট সুর দেখা যায়। একদল মনে করেন, প্রযুক্তি যত নিখুঁতই হোক, শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত মানুষের হাতেই থাকে বলে তারকা ও পরাশক্তি দলগুলোর প্রতি একধরনের নরম দৃষ্টিভঙ্গি অবচেতনভাবেই কাজ করে। অন্যদল বলছেন, VAR না থাকলে বরং আরও বেশি অন্যায় সিদ্ধান্ত মাঠেই থেকে যেত-সমস্যা প্রযুক্তিতে নয়, রেফারিদের সিদ্ধান্তের ধারাবাহিকতার অভাবে।

সুতরাং,ফুটবল চিরকালই আবেগের খেলা, আর বিতর্ক তার চিরসঙ্গী। প্রযুক্তি নিঃসন্দেহে ভুলের সংখ্যা কমিয়েছে, কিন্তু মুছে দিতে পারেনি মানুষের বিচারবুদ্ধির সীমাবদ্ধতা। রদ্রির হাতের সেই মুহূর্ত হোক বা মিসরের বাতিল হওয়া গোল-প্রতিটি ঘটনাই মনে করিয়ে দেয়, যতদিন শেষ সিদ্ধান্তটা মানুষই নেবে, ততদিন ন্যায্যতা আর ধারাবাহিকতা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাবে। আর বাংলাদেশের মতো দেশের কোটি ফুটবলপ্রেমী হৃদয় নিয়ে সেই বিতর্কে অংশ নেবে, মাঠের বাইরে থেকেও।

লেখক: কলাম লেখক ও কর্পোরেট ক্রীড়া বিশ্লেষক

ফেসবুকে আমরা

মন্তব্য করুন

guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted

সর্বাাধিক পঠিত নিউজ

Scroll to Top