তিন জেলায় তিস্তার পানি কমলেও চরাঞ্চলে বাড়ছে আর্তনাদ: পানিবন্দি হাজারো পরিবার, ৪ দিন ধরে জ্বলছে না চুলা

রবিউল ইসলাম বাবুল, রংপুর বিভাগীয় প্রতিনিধিঃ

টানা কয়েকদিনের মুষলধারে বৃষ্টি আর ভারতীয় সীমান্ত থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলের তাণ্ডবে লালমনিরহাটে তিস্তা নদীর অববাহিকায় বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।

উজান থেকে ধেয়ে আসা পানির তোড়ে জেলার হাতীবান্ধা, পাটগ্রাম, কালীগঞ্জ, আদিতমারী ও সদর উপজেলার বিস্তীর্ণ চরাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। আজ মঙ্গলবার (৩০জুন) দুপুরের পর থেকে পানি ধীরে ধীরে কমতে শুরু করেছে, তবে দুর্গত এলাকার মানুষের দুর্ভোগ কাটেনি। রাস্তাঘাট, ঘরবাড়ি ও ফসলি জমি এখনো পানির নিচে তলিয়ে থাকায় পানিবন্দি হাজার হাজার মানুষের দিন কাটছে চরম আতঙ্কে।

​লালমনিরহাটের হাতীবান্ধা উপজেলায় অবস্থিত দেশের বৃহত্তম সেচ প্রকল্প তিস্তা ব্যারাজের ডালিয়া পয়েন্টে পানি প্রবাহের মাত্রা ওঠানামা করছে। ডালিয়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) নিয়ন্ত্রণ কক্ষের তথ্য অনুযায়ী, ​২৯ জুন (রবিবার) সন্ধ্যা ৬টা: উজানের তীব্র ঢলে তিস্তার পানি ডালিয়া পয়েন্টে বিপৎসীমার ৭ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হতে থাকে এবং রাতভর এই ধারা বজায় থাকে।

​৩০ জুন (সোমবার) সকাল ৬টা: পরিস্থিতি কিছুটা থিতু হয়ে পানি বিপৎসীমার সমান্তরালে চলে আসে।

৩০ জুন (সোমবার) দুপুর ১টা: সর্বশেষ রেকর্ড অনুযায়ী, ডালিয়া পয়েন্টে তিস্তার পানি প্রবাহ ৫২.০০ মিটার ওপরে অবস্থান করছে, যা বিপৎসীমার (স্বাভাবিক মাত্রা ৫২.১৫ মিটার) ১৫ সেন্টিমিটার নিচে।

 

​ডালিয়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী অমিতাভ চৌধুরী জানান, ওপারে ভারতের অংশে বৃষ্টিপাত কমায় পাহাড়ি ঢলের চাপ কমেছে। ফলে ডালিয়া পয়েন্টে পানি দ্রুত কমছে। তবে নদীপাড়ের ভাঙন ও আকস্মিক পানি বৃদ্ধির আশঙ্কায় ফ্ল্যাড বাইপাস এলাকাসহ তিস্তাপাড়ের বাসিন্দাদের সার্বক্ষণিক সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

​পানি কমতে শুরু করলেও তিস্তার চরাঞ্চল ও নিম্নাঞ্চলের বাস্তব চিত্র অত্যন্ত ভয়াবহ। আদিতমারী উপজেলার মহিষখোচা ইউনিয়নের গোবর্ধন ও কুটিরপাড় এলাকার বাসিন্দারা জানিয়েছেন, হঠাৎ পানি বাড়ায় তারা ঘরের আসবাবপত্র সরানোর সুযোগও পাননি।

​নারীদের চরম বিপাক: চরাঞ্চলের শত শত স্যানিটারি ল্যাট্রিন এবং টিউবওয়েল বন্যার পানিতে তলিয়ে গেছে। ফলে বিশুদ্ধ খাবার পানির তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। সবচেয়ে বেশি বিপদে পড়েছেন চরাঞ্চলের নারীরা। চারদিকে পানি থাকায় এবং উচুঁ স্থানে পর্যাপ্ত পর্দাঘেরা শৌচাগার না থাকায় নারী, কিশোরী ও বৃদ্ধারা চরম মানবেতর পরিস্থিতির মুখোমুখি হচ্ছেন।

​পশুখাদ্যের অভাবে চারণভূমি ও খড়ের গাদা পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় গবাদিপশু নিয়ে উঁচু সড়ক ও বাঁধে আশ্রয় নিয়েছেন কৃষকরা। মহিষখোচার হায়দার আলী (৫৫) বলেন, “নিজেরা তো শুকনো চিঁড়ে-মুড়ি খেয়ে আছি, কিন্তু গরু-ছাগলগুলোকে খাওয়ানোর মতো কোনো ঘাস বা খড় নাই। চারদিকে শুধু পানি।”

​ তিস্তাপাড়ের অন্তত ১৫টি প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে বন্যার পানি প্রবেশ করায় পাঠদান কার্যক্রম অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। অনেক বিদ্যালয়ের মাঠ ও শ্রেণিকক্ষ এখন স্থানীয়দের আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।

​বন্যাদুর্গত এলাকার বাসিন্দাদের অভিযোগ, প্রতি বছর বন্যা হলে স্বাস্থ্য বিভাগের পক্ষ থেকে অস্থায়ী মেডিকেল ক্যাম্প করা হলেও, এবার এখন পর্যন্ত কোনো স্বাস্থ্যকর্মীর দেখা মেলেনি। ফলে পানিবাহিত চর্মরোগ ও ডায়রিয়ার প্রকোপ বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। নৌকা ও কলার ভেলাই এখন যাতায়াতের একমাত্র মাধ্যম হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এব্যপারে আদিতমারী উপজেলা নবাগত নির্বাহী অফিসার ঞ্জন বিশ্বাস,সঙ্গে মুঠোফোনে আলোচনা হলে তিনি দৈনিক আমার বাংলাদেশ সাংবাদিক কে বলেন, আমরা বন্যা কবলিত এলাকাগুলো নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছি। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর সঠিক তালিকা তৈরি করার জন্য স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তালিকা হাতে পেলেই চাল ও শুকনো খাবার ঘরে ঘরে পৌঁছে দেওয়া হবে।

বন্যা পরিস্থিতি নিযে ললমনিরহাট জেলা প্রশাসক মুহাঃ রাশেদুল হক প্রধান জানিয়েছেন, দুর্যোগ মোকাবিলায় জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে আগাম প্রস্তুতি হিসেবে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের অনুকূলে ২২০ মেট্রিক টন চাল এবং নগদ সাড়ে ৫ লাখ টাকা জরুরি বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। ইতিমধ্যে আদিতমারী ও হাতীবান্ধার কিছু দুর্গম চরাঞ্চলে সীমিত আকারে সরকারি সহায়তা পৌঁছাতে শুরু করেছে এবং এই কার্যক্রম আরও জোরদার করা হবে।

​আবহাওয়া অফিসের পূর্বাভাস অনুযায়ী, আগামী ২৪ ঘণ্টায় ভারী বৃষ্টির সম্ভাবনা কম থাকায় সন্ধ্যার মধ্যে চরাঞ্চলের পানি আরও নেমে পরিস্থিতি অনেকটাই স্বাভাবিক হয়ে আসবে বলে আশা করা হচ্ছে।

ফেসবুকে আমরা

মন্তব্য করুন

guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted

সর্বাাধিক পঠিত নিউজ

Scroll to Top