মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে তদন্ত, নিষিদ্ধের সুযোগ রয়েছে আইনে

নিজস্ব প্রতিনিধি:

মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে রাজনৈতিক দল হিসেবে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু হয়েছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে। তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে দলটির কার্যক্রম স্থগিত বা নিষিদ্ধ, নিবন্ধন বাতিল এবং সম্পদ জব্দের মতো পদক্ষেপ নেওয়ার সুযোগ রয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

বিশেষ দিক হলো, আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে যে আইনে তদন্ত চলছে, সেই আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনটি প্রথম প্রণয়ন করেছিল আওয়ামী লীগ সরকারই। পরে ২০১৩ সালে আইন সংশোধন করে এতে ‘সংগঠন’ বা ‘অরগানাইজেশন’ শব্দ যুক্ত করা হয়। বর্তমান আইনি কাঠামোয় রাজনৈতিক দলও সংগঠনের সংজ্ঞার অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে দল হিসেবে বিচার প্রক্রিয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।

ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থার সমন্বয়ক আনসার উদ্দিন খান পাঠান জানিয়েছেন, রাজনৈতিক দল হিসেবে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে তদন্ত কার্যক্রম চলমান রয়েছে। জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক আন্দোলনের করা একটি আবেদনের পর তদন্ত সংস্থার একটি দল বিষয়টি অনুসন্ধান শুরু করে।

তিনি বলেন, স্বাধীনতার পর থেকে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে উত্থাপিত বিভিন্ন অপরাধের অভিযোগ তদন্তের আওতায় আনা হচ্ছে। ঘটনাগুলো দীর্ঘ সময়ের হওয়ায় তদন্ত শেষ করতে সময় লাগতে পারে বলেও জানান তিনি।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনের সংশোধিত বিধান অনুযায়ী, কোনো সংগঠন মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটন, নির্দেশ, সহায়তা, উসকানি, ষড়যন্ত্র বা মদদ দেওয়ার সঙ্গে জড়িত থাকলে ট্রাইব্যুনাল তার কার্যক্রম স্থগিত বা নিষিদ্ধ করতে পারবেন। একই সঙ্গে সংগঠনের নিবন্ধন বা লাইসেন্স বাতিল এবং সম্পদ জব্দের নির্দেশও দেওয়া যেতে পারে।

আইনে ‘সংগঠন’ বলতে রাজনৈতিক দল, তার অঙ্গসংগঠন, সহযোগী সংগঠন এবং সংশ্লিষ্ট সমর্থক গোষ্ঠীকেও বোঝানো হয়েছে। ফলে তদন্তে প্রাথমিকভাবে অভিযোগের ভিত্তি পাওয়া গেলে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক বিচারিক পদক্ষেপ নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ সম্প্রতি বলেছেন, রাজনৈতিক দল হিসেবে আওয়ামী লীগের বিচারের দাবি বিভিন্ন মহল থেকে এসেছে এবং এ বিষয়ে তদন্ত চলছে। তদন্ত শেষে প্রয়োজনীয় প্রমাণ পাওয়া গেলে দলটিকে বিচারের কাঠগড়ায় আনা হবে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান বলেছেন, আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ হবে কি না, তা নির্ধারণ করবে আদালত। বিচার প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার আগে এ বিষয়ে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে না পৌঁছানোর আহ্বান জানান তিনি।

ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম বলেন, তদন্ত সংস্থার প্রতিবেদনে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে প্রাথমিক অভিযোগের ভিত্তি পাওয়া গেলে প্রসিকিউশন আইন অনুযায়ী পরবর্তী পদক্ষেপ নিতে পারবে। তিনি জানান, ১৯৭৩ সালের ট্রাইব্যুনাল আইন এবং পরবর্তী সংশোধনীগুলো আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ই প্রণীত হয়েছিল।

সাবেক চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম বলেন, বিদ্যমান আইনে রাজনৈতিক দলের বিচার সম্ভব এবং অপরাধ প্রমাণিত হলে দলটির বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা, নিবন্ধন স্থগিত বা বাতিল এবং সম্পদ জব্দের মতো ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে।

তবে এই তদন্তের উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মনজিল মোরসেদ। তিনি বলেন, দল হিসেবে অপরাধ প্রমাণের জন্য দেখাতে হবে যে, দলীয় সিদ্ধান্ত বা সাংগঠনিক কাঠামোর মাধ্যমে অপরাধ সংঘটিত হয়েছে। তার মতে, আওয়ামী লীগকে রাজনৈতিকভাবে চাপে রাখা বা নির্বাচনের বাইরে রাখার উদ্দেশ্যেও এ ধরনের বিচার উদ্যোগ নেওয়া হতে পারে।

বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে ‘ক্রসফায়ার’ বা বিচারবহির্ভূত হত্যার অভিযোগে বহু মানুষের প্রাণহানি ঘটে। পাশাপাশি জাতিসংঘের এক প্রতিবেদনে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের আন্দোলনে ব্যাপক প্রাণহানির কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এসব অভিযোগের প্রেক্ষাপটেই দল হিসেবে আওয়ামী লীগের ভূমিকা তদন্তের বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে।

ফেসবুকে আমরা

মন্তব্য করুন

guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted

সর্বাাধিক পঠিত নিউজ

Scroll to Top