২৭শে এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ১৪ই বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ | ১০ই জিলকদ, ১৪৪৭ হিজরি

নীলফামারীতে চাহিদার চেয়ে ৫০ হাজার বেশি পশু প্রস্তুত, খামারিদের ব্যস্ততা তুঙ্গে

মো. সাইফুল ইসলাম, নীলফামারী প্রতিনিধি:

আসন্ন পবিত্র ঈদুল আজহাকে ঘিরে নীলফামারীর খামারগুলোতে এখন পুরোদমে চলছে কোরবানির পশু প্রস্তুতির শেষ ধাপ। ঈদের প্রায় এক মাস আগে থেকেই জেলার খামারিরা গরু-ছাগল লালন-পালন, পরিচর্যা ও মোটাতাজাকরণে ব্যস্ত সময় পার করছেন। সুস্থ, সবল ও রোগমুক্ত পশু বাজারে সরবরাহের লক্ষ্যে দিন-রাত পরিশ্রম করছেন খামারি ও তাদের কর্মচারীরা।

জেলা প্রাণিসম্পদ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, এ বছর নীলফামারীতে বাণিজ্যিক ও পারিবারিক মিলিয়ে মোট ৩৪ হাজার ৮০৩টি খামারে ২ লাখ ৮২ হাজার ৮৫০টি কোরবানিযোগ্য পশু প্রস্তুত রয়েছে। এর মধ্যে ষাঁড় ৫১ হাজার ৮৮১টি, বলদ ৪ হাজার ১৬৪টি, গাভী ২৫ হাজার ৮৬৫টি, মহিষ ৯৪টি, ছাগল ১ লাখ ৮৫ হাজার ৩০৯টি এবং ভেড়া ১৫ হাজার ৫৩২টি। জেলার মোট চাহিদা ২ লাখ ৩২ হাজার ৬৭৬টি হলেও প্রায় ৫০ হাজার ১৭৪টি পশু উদ্বৃত্ত থাকবে, যা দেশের অন্যান্য জেলায় সরবরাহ করা হবে।

সরেজমিনে নীলফামারী সদর উপজেলার বিভিন্ন খামার ঘুরে দেখা যায়, খামারিরা প্রাকৃতিক উপায়ে গরু মোটাতাজাকরণে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছেন। পশুর খাদ্যতালিকায় রয়েছে কাঁচা ঘাস, ভুট্টা, খৈল, সরিষার খৈল, গমের ভুসি, ধানের কুঁড়া ও খড়। নিয়মিত গোসল, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন পরিবেশ ও পর্যাপ্ত বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হচ্ছে।

খামারিরা জানান, কোরবানির পশু সুস্থ রাখতে ভ্যাকসিন, ভিটামিন ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসা নিয়মিত দেওয়া হচ্ছে। ফলে এ জেলার পশুর প্রতি ক্রেতাদের আস্থা বাড়ছে। তবে, পশুখাদ্যের মূল্যবৃদ্ধি খামারিদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ভুট্টা, খৈল ও অন্যান্য খাদ্যের দাম বাড়ায় গরু পালনে খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। তবুও কোরবানির বাজারে ভালো দামের প্রত্যাশায় খামারিরা শেষ মুহূর্তের পরিচর্যায় কোনো কমতি রাখছেন না।

নীলফামারী সদরের রামনগর চাঁদেরহাট এলাকার খামারি গোলাম রব্বানি বলেন, “এ বছর ৩২টি গরু পালন করেছি। ব্যবসায়ীরা ইতোমধ্যে বাড়িতে এসে দরদাম করছেন। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে ভালো দাম পাওয়ার আশা করছি।”

জেলার বিভিন্ন এলাকায় ইতোমধ্যে পশু ব্যবসায়ী ও ব্যাপারীরা খামারে গিয়ে গরু দেখে দরদাম শুরু করেছেন। অনেক খামারি খামার থেকেই পশু বিক্রি করছেন। পাশাপাশি অনলাইন প্ল্যাটফর্মেও বিক্রির প্রবণতা বাড়ছে। তবে কোরবানির হাট পুরোপুরি জমে উঠতে আরও কিছুদিন সময় লাগবে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

এদিকে, খামারিদের একাংশ ভারতীয় গরুর সম্ভাব্য আমদানি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাদের মতে, ভারতীয় গরু বাজারে প্রবেশ করলে দেশীয় গরুর দাম কমে যেতে পারে। তবে আমদানি নিয়ন্ত্রণে থাকলে দেশীয় খামারিরাই বেশি লাভবান হবেন বলে তারা মনে করেন।

নীলফামারী সদরের পুলিশ লাইন্স এলাকার ‘আম্মার লাইভস্টক অ্যান্ড এগ্রো’-এর স্বত্বাধিকারী মো. সাইফুল আযম সৈকত বলেন, “দেশি গরুর চাহিদা দিন দিন বাড়ছে। ভারতীয় গরু না এলে আমাদের খামারিরা ভালো লাভ করতে পারবেন।”

অন্যদিকে ইটাখোলা বনানী আবাসিক এলাকার ‘মোহনা এগ্রো ফার্ম’-এর স্বত্বাধিকারী নুরুজ্জামান সুমন জানান, এবছর তার খামারে ৫০টি দেশি ষাঁড় প্রস্তুত রয়েছে। ইতোমধ্যে অনেক ক্রেতা আগাম বুকিং দিয়েছেন। তিনি বলেন, “খরচ বেড়েছে, কিন্তু প্রাকৃতিক উপায়ে গরু মোটাতাজা করায় ক্রেতাদের আগ্রহ বেশি।”

অপরদিকে, কেমিক্যাল বা হরমোন ব্যবহার করে গরু মোটাতাজাকরণ ঠেকাতে প্রাণিসম্পদ বিভাগ নিয়মিত মনিটরিং করছে। খামারিদের প্রশিক্ষণ ও পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে প্রাকৃতিক পদ্ধতিতে পশু লালন-পালনের জন্য বলে জানান প্রাণীসম্পদ বিভাগ।

নীলফামারী জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ও ভেটেরিনারি ডা. আবুল কালাম আজাদ বলেন, “খামারিদের দানাদার খাদ্য, কাঁচা ঘাস ও ভিটামিন ব্যবহারের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। কোনো ধরনের নিষিদ্ধ রাসায়নিক ব্যবহার না করতে কঠোর নির্দেশনা রয়েছে।”

জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. রাশেদুল ইসলাম জানান, “এ বছর জেলার চাহিদার তুলনায় পর্যাপ্ত পশু প্রস্তুত রয়েছে। কোরবানির হাটে নিরাপত্তা, স্বাস্থ্যসেবা ও নির্বিঘ্ন বেচাকেনা নিশ্চিত করতে প্রশাসন প্রস্তুত রয়েছে। পশু অসুস্থ হলে তাৎক্ষণিক চিকিৎসা দেওয়ার ব্যবস্থাও থাকবে।”

সব মিলিয়ে, কোরবানির ঈদ সামনে রেখে নীলফামারীতে পশু খামারগুলোতে এখন ব্যস্ততা চরমে। প্রাকৃতিক পদ্ধতিতে লালিত দেশীয় পশুর সরবরাহ ও চাহিদা—দুই দিক থেকেই ইতিবাচক অবস্থানে রয়েছে। খরচ বৃদ্ধি ও বাজার অনিশ্চয়তা থাকলেও ভালো দামের প্রত্যাশায় আশাবাদী সংশ্লিষ্টরা।

ফেসবুকে আমরা

মন্তব্য করুন

guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments

সর্বাাধিক পঠিত নিউজ

Scroll to Top