জাহেদুল ইসলাম আল রাইয়ান:
প্রাচীন সভ্যতা ও ইসলামি ঐতিহ্যের প্রাণকেন্দ্র মিশরেরে সাহাতুল ইমাম আহমদ রেজা রহ. এ এক গম্ভীর, আধ্যাত্মিক ও জ্ঞানগর্ভ পরিবেশে পালিত হয়েছে তাজুশ্ শারীয়াহ শাইখ আখতার রেজা খান রহ. এর মৃত্যুবার্ষিকী। এ উপলক্ষে আয়োজিত আন্তর্জাতিক ইলমি সম্মেলন ও ইজাযত প্রদান অনুষ্ঠানটি শুধু একটি স্মরণানুষ্ঠানই নয়, বরং এটি ছিল ইলম, তরিকত, ইতিহাস ও ঐতিহ্যের এক অনন্য সমাবেশ যেখানে অতীতের গৌরব বর্তমানের চেতনাকে আলোকিত করে ভবিষ্যতের পথরেখা অঙ্কন করেছে।
মিশর বিশেষত আল-আজহারের ভূমি হাজার বছরের বেশি সময় ধরে ইসলামী জ্ঞানচর্চার অন্যতম প্রধান কেন্দ্র। সেই ঐতিহ্যেরই ধারাবাহিকতায় অনুষ্ঠিত এ আয়োজন যেন এক প্রতীকী সেতুবন্ধন, যেখানে উপমহাদেশের ইলমি ঐতিহ্য ও আরব বিশ্বের জ্ঞানধারা একত্রে মিলিত হয়েছে।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সুদানের ধর্মমন্ত্রী পীর শাইখ ড. মুহাম্মদ মুস্তফা। তাঁর প্রাঞ্জল ও হৃদয়গ্রাহী বক্তব্যে তিনি ইলমে তরিকতের গভীর দর্শন, আত্মশুদ্ধির প্রয়োজনীয়তা এবং আধুনিক বিশ্বে আধ্যাত্মিকতার সংকট নিয়ে বিশ্লেষণধর্মী আলোচনা করেন। তিনি বলেন, “যে ইলম হৃদয়কে পরিশুদ্ধ করে না, তা কেবল শব্দের সমষ্টি আর যে তরিকত মানুষকে আল্লাহর দিকে নিয়ে যায় না, তা কেবল বাহ্যিক রীতি।” তিনি তাজুশ্ শারীয়াহ রহ. এর ইলমি ও রুহানি খেদমতের কথা গভীর শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করেন এবং তাঁর রূহের মাগফিরাত কামনা করে দোয়া করেন। পাশাপাশি তিনি উপস্থিত শিক্ষার্থীদের ইজাযত প্রদান করেন, যা তাদের ইলমি যাত্রার এক গুরুত্বপূর্ণ স্বীকৃতি।
ইয়ামেন থেকে আগত শাইখ হুসাইন বুখারী তাঁর বক্তব্যে তাজুশ্ শারীয়াহ রহ. এর জীবনকে “ইলম, আমল ও আধ্যাত্মিকতার সমন্বয়ে গঠিত এক জীবন্ত দৃষ্টান্ত” হিসেবে আখ্যায়িত করেন। তিনি বলেন, তাঁর দরবার ছিল জ্ঞানপিপাসুদের জন্য এক আলোকিত আশ্রয়স্থল, যেখানে মানুষ কেবল ফতোয়া নয়, বরং জীবনের দিশা খুঁজে পেত। তিনি উপস্থিত ছাত্রদের ইজাযত প্রদান করেন এবং তাদেরকে ইলমের সঙ্গে আখলাক ও ইখলাসের সমন্বয় সাধনের আহ্বান জানান।
অনুষ্ঠানে আল-আজহার সংশ্লিষ্ট বিশিষ্ট আলেম শাইখ ড. আতিয়্যাহ মুস্তাফা আজহারী তাঁর গভীর গবেষণাধর্মী আলোচনায় আল-আজহারের সহস্রাব্দব্যাপী ঐতিহ্য, এর শিক্ষাব্যবস্থার বৈশিষ্ট্য এবং বিশ্ব মুসলিম উম্মাহর জন্য এর অবদান তুলে ধরেন। তিনি শাইখ সালেহ আল-জাফারী রহ.এর জীবন ও আধ্যাত্মিক প্রভাব নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে বলেন, “আল-আজহার কেবল একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নয়, এটি এক অবিচ্ছিন্ন নূরের শৃঙ্খল, যা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে ইলম ও আধ্যাত্মিকতার আলো ছড়িয়ে দিয়েছে।” তিনি তাজুশ্ শারীয়াহ রহ.এর ইলমি গভীরতা ও তাঁর চিন্তার ব্যাপ্তি তুলে ধরে শিক্ষার্থীদের ইজাযত প্রদান করেন।
এছাড়াও অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন আন্তর্জাতিক অঙ্গনের প্রখ্যাত আলেম শাইখ মারওয়ান শাবান, শাইখ মুহাল্লিফ ইয়াহইয়া কাদেরী এবং শাইখ আব্দুল করিম আজহারী। তাঁদের উপস্থিতি ও দিকনির্দেশনামূলক বক্তব্য অনুষ্ঠানটিকে আরও সমৃদ্ধ ও তাৎপর্যপূর্ণ করে তোলে।
তাজুশ্ শারীয়াহ শাইখ আখতার রেজা খান রহ. ছিলেন উপমহাদেশের এক অনন্য আলোকবর্তিকা একজন প্রাজ্ঞ ফকীহ, সুদক্ষ মুফতি এবং আধ্যাত্মিক পথপ্রদর্শক। তিনি তাঁর জীবন উৎসর্গ করেছিলেন ইসলামের খেদমতে। অসংখ্য ফতোয়া প্রদান, ইলমি গবেষণা, শিক্ষাদান এবং তরিকতের মাধ্যমে তিনি লক্ষ লক্ষ মানুষের জীবনকে প্রভাবিত করেছেন। তাঁর দরবার ছিল যেন এক উন্মুক্ত জ্ঞানকেন্দ্র, যেখানে দেশ-বিদেশ থেকে আগত শিক্ষার্থীরা ইলম ও আধ্যাত্মিকতার দীক্ষা গ্রহণ করত।
তাঁর ইলমি গভীরতা, তাকওয়া, বিনয় এবং ভারসাম্যপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি তাঁকে বিশ্ব মুসলিম সমাজে এক অনন্য মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করেছে। তিনি ঐতিহ্য ও আধুনিকতার মাঝে এক সুষম সমন্বয় গড়ে তুলেছিলেন, যা আজও অনুসরণীয়।
তাঁর ইন্তিকালের পর অনুষ্ঠিত জানাজার নামাজে লক্ষ লক্ষ মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ বিশ্বব্যাপী আলোচিত হয় এবং এক বিরল রেকর্ড হিসেবে ইতিহাসে স্থান পায়। এটি ছিল তাঁর প্রতি মানুষের অকৃত্রিম ভালোবাসা, শ্রদ্ধা ও আস্থার এক অবিস্মরণীয় বহিঃপ্রকাশ যা প্রমাণ করে, একজন আলেম কেবল জ্ঞান দিয়েই নয়, বরং চরিত্র ও আখলাক দিয়েও মানুষের হৃদয়ে স্থান করে নেন।
বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান, সুদান, ইয়ামেন ও মিশরসহ বিভিন্ন দেশের শিক্ষার্থীদের প্রাণবন্ত অংশগ্রহণে অনুষ্ঠানটি এক আন্তর্জাতিক মিলনমেলায় রূপ নেয়। ভিন্ন ভাষা, ভিন্ন সংস্কৃতি তবুও এক অভিন্ন লক্ষ্য, ইলম অর্জন, আত্মশুদ্ধি এবং ইসলামী ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতা রক্ষা।
এই মহাসম্মেলন কেবল একটি স্মৃতিচারণ নয়, এটি এক নবজাগরণের বার্তা যেখানে ইলম, তরিকত ও ঐতিহ্য একত্রে মানবতার কল্যাণে নতুন করে পথ দেখায়। এমন আয়োজন নিঃসন্দেহে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে আলোকিত করবে এবং ইসলামী জ্ঞানচর্চার ধারাকে আরও সুদৃঢ় করবে।
লেখক কলামিস্ট ও শিক্ষার্থী, আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়,কায়রো, মিশর