মো. সাইফুল ইসলাম, নীলফামারী প্রতিনিধি:
নীলফামারীর বিভিন্ন পশুর হাটে সরকারি নির্ধারিত হারের তোয়াক্কা না করে ক্রেতা ও খামারিদের কাছ থেকে অতিরিক্ত হাসিল (টোল) আদায়ের মাধ্যমে লাখ লাখ টাকার অবৈধ বাণিজ্যের অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের দাবি, প্রশাসন অভিযানে গিয়ে অভিযোগের সত্যতা পেলেও ইজারাদারদের বিরুদ্ধে নেওয়া ব্যবস্থা ছিল অত্যন্ত দুর্বল ও দায়সারা। এতে অনিয়ম বন্ধ হওয়ার বদলে আরও উৎসাহিত হচ্ছে ইজারাদার সিন্ডিকেট।
মঙ্গলবার (২৬ মে) বিকেলে জেলার জলঢাকা উপজেলার মীরগঞ্জ পশুর হাটে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট জান্নাতুল ফেরদৌস হ্যাপি। অভিযানে সরকারি নির্ধারিত হারের চেয়ে অতিরিক্ত হাসিল আদায়ের প্রমাণ পাওয়ায় হাটের ইজারাদারকে মাত্র ৩ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়।
এর আগে সোমবার (২৫ মে) বিকেলে নীলফামারী সদর উপজেলার রামগঞ্জ পশুর হাটে অভিযান চালান সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মুবাশ্বিরা আমাতুল্লাহ। একই অভিযোগে সেখানে ইজারাদারকে ২ হাজার ২০০ টাকা জরিমানা করা হয়।
তবে স্থানীয় খামারি, ব্যবসায়ী ও সাধারণ ক্রেতাদের অভিযোগ— কোরবানির মৌসুমকে কেন্দ্র করে প্রতিটি হাটে প্রতিদিন লাখ লাখ টাকার অতিরিক্ত হাসিল আদায় হলেও প্রশাসনের এই সামান্য জরিমানা কার্যত ‘লোক দেখানো ব্যবস্থা’ ছাড়া কিছুই নয়।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে জেলার বড় পশুর হাটগুলোতে প্রতিদিন গড়ে প্রায় এক হাজার গরু কেনাবেচা হচ্ছে। সরকারি নির্ধারিত হাসিল প্রতি গরুর জন্য ৬০০ টাকা হলেও অনেক হাটে আদায় করা হচ্ছে ১ হাজার টাকা পর্যন্ত। ফলে প্রতিটি গরুর বিপরীতে অতিরিক্ত নেওয়া হচ্ছে প্রায় ৪০০ টাকা।
সেই হিসাবে একটি হাটেই দিনে অতিরিক্ত আদায় হচ্ছে প্রায় ৪ লাখ টাকা। অথচ সেখানে প্রশাসনের জরিমানা মাত্র ২ থেকে ৩ হাজার টাকা হওয়ায় জনমনে ক্ষোভ ও প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
হাটে আসা কয়েকজন খামারি ও ক্রেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “ভ্রাম্যমাণ আদালত চলে যাওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই আবার আগের মতো অতিরিক্ত টাকা আদায় শুরু হয়। এত কম জরিমানা করলে ইজারাদারদের কিছুই হবে না। বরং তারা এটাকে ব্যবসার খরচ হিসেবেই ধরে নিচ্ছে।”
স্থানীয় ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, অতিরিক্ত হাসিল আদায়ের কারণে পশুর দামও অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাচ্ছে। এর প্রভাব পড়ছে সাধারণ ক্রেতাদের ওপর। অনেক ক্ষুদ্র খামারি বাধ্য হয়ে কম লাভে পশু বিক্রি করছেন।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে জলঢাকা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) জান্নাতুল ফেরদৌস হ্যাপি বলেন, “অভিযোগের সত্যতা পাওয়ায় ইজারাদারকে ৩ হাজার টাকা আর্থিক জরিমানা করা হয়েছে এবং ভবিষ্যতে এমন কার্যক্রম বন্ধ রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।” তবে জরিমানার পরিমাণ এত কম কেন— এ প্রশ্নের কোনো স্পষ্ট জবাব তিনি দেননি।
অন্যদিকে নীলফামারী সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মুবাশ্বিরা আমাতুল্লাহর মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি।
স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, পশুর হাটে অতিরিক্ত হাসিল আদায় এখন প্রকাশ্য চাঁদাবাজিতে পরিণত হয়েছে। তারা বলছেন, শুধু নামমাত্র জরিমানা নয়— অনিয়মে জড়িত ইজারাদারদের বিরুদ্ধে ইজারা বাতিল, বড় অঙ্কের অর্থদণ্ড এবং নিয়মিত মনিটরিংয়ের ব্যবস্থা না করলে এই সিন্ডিকেট কোনোভাবেই নিয়ন্ত্রণে আসবে না।
তাদের মতে, কোরবানির ঈদকে কেন্দ্র করে সাধারণ মানুষের পকেট কাটার এই অনিয়ম বন্ধে জেলা প্রশাসন ও স্থানীয় প্রশাসনকে আরও কঠোর ও কার্যকর ভূমিকা নিতে হবে।