নিজস্ব প্রতিনিধি:
বাংলাদেশের আলোচিত ব্যবসায়ী ও এস আলম গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান সাইফুল আলম এবং তার স্ত্রীর মালিকানাধীন একটি সম্পত্তি জব্দ করেছে সাইপ্রাস কর্তৃপক্ষ। ব্যাংক জালিয়াতি ও অর্থপাচারের অভিযোগে চলমান ফৌজদারি তদন্তের অংশ হিসেবে এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
স্থানীয় সংবাদমাধ্যম ‘সাইপ্রাস মেইল’-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সাইপ্রাসের মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ ইউনিট (মোকাস)-এর আবেদনের পর গত ১৯ মে নিকোসিয়া জেলা আদালত সম্পত্তি জব্দের আদেশ দেন। বাংলাদেশ সরকারের পাঠানো অনুরোধ এবং দুই দেশের পারস্পরিক আইনি সহযোগিতা চুক্তির আওতায় এ সিদ্ধান্ত কার্যকর করা হয়।
তবে সাইফুল আলম তার বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছেন।
আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী, সাইপ্রাসের পারেক্লিশা এলাকায় অবস্থিত তার মালিকানাধীন একটি দোতলা আবাসিক ভবন ক্রোক করা হয়েছে।
বাংলাদেশি তদন্তকারী সংস্থাগুলোর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০০৯ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে পরিচালিত বিভিন্ন কোম্পানির আর্থিক লেনদেন, জালিয়াতির মাধ্যমে ঋণ গ্রহণ, অবৈধ সম্পদ অর্জন এবং অর্থপাচারের অভিযোগ খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
তদন্তের অংশ হিসেবে ২০১৬ সালে প্রতিষ্ঠিত সাইপ্রাসভিত্তিক কোম্পানি ‘এসিএলএআরই ইন্টারন্যাশনাল’সহ সাইপ্রাস, ব্রিটিশ ভার্জিন আইল্যান্ডস ও জার্সিতে নিবন্ধিত বিভিন্ন ট্রাস্ট ও প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রমও পর্যালোচনা করছেন তদন্তকারীরা।
এদিকে সাইপ্রাসে সম্পত্তি জব্দের আদেশ জারির একদিন পর বাংলাদেশে একটি আদালত সাইফুল আলম এবং তার ১০ জন আত্মীয় ও সহযোগীকে পাঁচ মাসের কারাদণ্ড দেন।
মামলার অভিযোগে বলা হয়, ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ থেকে এস আলম গ্রুপের একটি সহযোগী প্রতিষ্ঠান প্রায় ৬০ লাখ ইউরো ঋণ নিয়ে ১৩৪টি বাস কেনার কথা থাকলেও সেই অর্থ নির্ধারিত কাজে ব্যবহার করা হয়নি।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, বিষয়টি শুধু একটি ঋণ জালিয়াতির ঘটনায় সীমাবদ্ধ নয়। এস আলম-সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকসহ একাধিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে বিপুল পরিমাণ ঋণ নিয়েছে, যার বড় অংশ পরবর্তীতে খেলাপি ঋণে পরিণত হয়েছে।
বাংলাদেশি তদন্তকারীরা খতিয়ে দেখছেন, এসব ঋণের অর্থ জটিল আন্তর্জাতিক করপোরেট নেটওয়ার্কের মাধ্যমে বিদেশে পাচার করা হয়েছে কি না।
সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর জানিয়েছেন, এ প্রক্রিয়ায় দেশ থেকে প্রায় ৮ বিলিয়ন ইউরো বা ৮০০ কোটি ইউরোর বেশি অর্থ বিদেশে পাচার হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তদন্তকারীদের মতে, ওই অর্থের একটি অংশ সাইপ্রাস, সিঙ্গাপুর এবং অন্যান্য দেশে সম্পত্তি কেনার কাজে বিনিয়োগ করা হয়েছে।
অন্যদিকে সাইফুল আলমের পক্ষে আন্তর্জাতিক আইন প্রতিষ্ঠান কুইন ইমানুয়েল এক বিবৃতিতে দাবি করেছে, তার সব আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ বৈধ উৎস থেকে অর্থায়িত হয়েছে। তাদের মতে, সম্পত্তি জব্দের পদক্ষেপটি অন্যায্য এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।
এ ঘটনায় সাইফুল আলম আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ বিরোধ নিষ্পত্তি সংস্থা (আইসিএসআইডি)-তে আইনি প্রক্রিয়াও শুরু করেছেন। তার দাবি, সম্পত্তি জব্দের সিদ্ধান্ত আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ সুরক্ষা চুক্তির পরিপন্থী।
উল্লেখ্য, সাইফুল আলম ২০১৬ সালে সাইপ্রাসের ‘সিটিজেনশিপ বাই ইনভেস্টমেন্ট’ বা ‘গোল্ডেন পাসপোর্ট’ কর্মসূচির মাধ্যমে দেশটির নাগরিকত্ব অর্জন করেন। পরবর্তীতে নানা বিতর্কের কারণে সাইপ্রাস সরকার ওই কর্মসূচি বন্ধ করে দেয়। তবে নাগরিকত্ব প্রদানের প্রক্রিয়া নিয়ে তদন্তে গঠিত নিকোলাটোস কমিটির প্রতিবেদনে তার নাম উল্লেখ করা হয়নি।