নিজস্ব প্রতিনিধি:
দীর্ঘ ১৯ বছর পর রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রথমবারের মতো জাতীয় বাজেট উপস্থাপন করতে যাচ্ছে বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার। অর্থনৈতিক চাপ, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বিনিয়োগ স্থবিরতা এবং ক্রমবর্ধমান ভর্তুকির বোঝার মধ্যেই আজ জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট পেশ করবেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের উপস্থিতিতে উপস্থাপিত হতে যাওয়া এই বাজেট বর্তমান সরকারের প্রথম বাজেট হিসেবে বিশেষ গুরুত্ব বহন করছে। সরকার জানিয়েছে, উন্নয়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং কল্যাণমুখী রাষ্ট্র গঠনের লক্ষ্য সামনে রেখে বাজেট প্রণয়ন করা হয়েছে।
অর্থমন্ত্রী সম্প্রতি সাংবাদিকদের বলেন, দেশের সব শ্রেণি-পেশার মানুষের কথা বিবেচনায় রেখেই এবারের বাজেট প্রস্তুত করা হয়েছে। তবে অর্থনীতিবিদদের মতে, সেই লক্ষ্য বাস্তবায়নের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন এবং বিনিয়োগ পরিবেশ পুনরুদ্ধার করা।
প্রস্তাবিত বাজেটে রাজস্ব আয়ের লক্ষ্য ধরা হয়েছে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা, যা চলতি অর্থবছরের লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় প্রায় ২৩ শতাংশ বেশি। এর মধ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) থেকে ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা, এনবিআর বহির্ভূত উৎস থেকে ২৫ হাজার কোটি টাকা এবং কর-বহির্ভূত আয় থেকে ৬৬ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহের পরিকল্পনা রয়েছে।
অন্যদিকে মোট বাজেট ব্যয় ও আয়ের ব্যবধান দাঁড়িয়েছে প্রায় ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা। এই ঘাটতি পূরণে সরকার ব্যাংক ঋণ, সঞ্চয়পত্র, অভ্যন্তরীণ উৎস এবং বৈদেশিক সহায়তার ওপর নির্ভর করবে। এর মধ্যে ব্যাংক খাত থেকেই এক লাখ কোটি টাকার বেশি ঋণ নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, বর্তমানে অর্থনীতি নানা চাপের মধ্যে রয়েছে। বেসরকারি বিনিয়োগের গতি কমে যাওয়া, রপ্তানি প্রবৃদ্ধির দুর্বলতা, শিল্প খাতে নতুন বিনিয়োগের স্থবিরতা এবং বৈদেশিক মুদ্রার চাপে ব্যবসায়িক পরিবেশ এখনও পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি।
এদিকে জ্বালানি, বিদ্যুৎ ও সার খাতে ভর্তুকির চাপও সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিভিন্ন মন্ত্রণালয় থেকে আগামী অর্থবছরের জন্য প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার কোটি টাকার ভর্তুকি চাহিদা অর্থ বিভাগে জমা পড়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের চলমান অস্থিরতার কারণে জ্বালানি ব্যয় বাড়লে এ চাপ আরও বৃদ্ধি পেতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
বাজেটে উদ্যোক্তা উন্নয়ন ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধির জন্য নতুন কিছু উদ্যোগের ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের (এসএমই) জন্য ২ হাজার কোটি টাকার তহবিল এবং উদ্যোক্তা উন্নয়ন তহবিলে ২২৫ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব থাকতে পারে।
এছাড়া ব্যবসা সহজীকরণে ‘বাংলাবিজ’ নামে একটি সমন্বিত ওয়ান-স্টপ ডিজিটাল সেবা চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। একই সঙ্গে কর প্রশাসন আধুনিকায়ন, অনলাইনে কর রিটার্ন দাখিল, দ্রুত কর ফেরত এবং কর-সংক্রান্ত বিরোধ নিষ্পত্তির ব্যবস্থাও বাজেটে অন্তর্ভুক্ত হতে পারে।
সামাজিক সুরক্ষা খাতেও নতুন উদ্যোগের আভাস রয়েছে। সরকার ২৫ লাখ নাগরিকের জন্য ‘ই-হেলথ কার্ড’ কর্মসূচি চালুর পরিকল্পনা করেছে। পাশাপাশি ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ডসহ বিভিন্ন সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতা ও বরাদ্দ বাড়ানোর প্রস্তাবও আসতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, বাজেটের সফলতা নির্ভর করবে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, বিনিয়োগে গতি আনা এবং রাজস্ব আদায়ের বাস্তব সক্ষমতার ওপর। একই সঙ্গে ঋণের কিস্তি পরিশোধ ও উন্নয়ন ব্যয়ের ভারসাম্য রক্ষা করাও সরকারের জন্য বড় পরীক্ষায় পরিণত হতে পারে।
আজ সংসদে উপস্থাপিত বাজেটের মাধ্যমে এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সরকারের সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা ও কৌশল স্পষ্ট হবে বলে প্রত্যাশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।