১৪ই জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ৩১শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ | ২৮শে জিলহজ, ১৪৪৭ হিজরি

নীলফামারীতে মানবিকতার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করলেন আনসার সদস্যরা

মো. সাইফুল ইসলাম, নীলফামারী প্রতিনিধি:

মানুষ মানুষের জন্য—এই চিরন্তন সত্যের আরেকটি বাস্তব উদাহরণ দেখা গেল নীলফামারী সদর হাসপাতালে। গভীর রাতে সড়ক দুর্ঘটনায় আহত এক অচেনা ব্যক্তির জীবন বাঁচাতে এবং তার স্বজনদের খুঁজে পেতে মানবিকতার অনন্য নজির স্থাপন করেছেন বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর কয়েকজন সদস্য।

শুক্রবার (১২ জুন) রাত আনুমানিক সাড়ে ৯টার দিকে নীলফামারী সদর উপজেলার টেক্সটাইল এলাকায় সড়ক দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত হয়ে রাস্তায় রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে ছিলেন এক ব্যক্তি। স্থানীয় যুবক সাগর ইসলাম মানবিক দায়িত্ববোধ থেকে তাকে উদ্ধার করে অটোরিকশাযোগে দ্রুত নীলফামারী সদর ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে যান।

কিন্তু হাসপাতালে পৌঁছানোর পর দেখা দেয় নতুন সংকট। আহত ব্যক্তির পরিচয় জানা নেই, সঙ্গে নেই কোনো স্বজনও। এমন পরিস্থিতিতে এগিয়ে আসেন হাসপাতালের জরুরি বিভাগে দায়িত্ব পালনরত আনসার সদস্য মাহমুদুল হাসান ও শ্রী খগেন। বিষয়টি জানার পর তারা দ্রুত গার্ডের পিসি মো. আমিনুর ইসলামকে অবহিত করেন।

খবর পেয়েই আমিনুর ইসলাম জরুরি বিভাগে ছুটে আসেন। তিনি নিজের পকেট থেকে আহত ব্যক্তিকে বহনকারী অটোরিকশার ভাড়া পরিশোধ করেন এবং চিকিৎসার সার্বিক দায়িত্ব গ্রহণ করেন। পরে আনসার সদস্যদের সহযোগিতায় দ্রুত জরুরি চিকিৎসা নিশ্চিত করা হয়। রাত ১১টার দিকে আহত ব্যক্তিকে হাসপাতালের সার্জারি ওয়ার্ডে ভর্তি করা হয়। চিকিৎসার প্রয়োজনীয় কিছু ওষুধও ব্যক্তিগত উদ্যোগে কিনে দেন আমিনুর ইসলাম।

এরপর শুরু হয় আহত ব্যক্তির পরিচয় শনাক্ত করার চেষ্টা। আনসার সদস্যরা তার সঙ্গে থাকা মানিব্যাগ তল্লাশি করে নগদ ৮ হাজার টাকা, একটি পরিচয়পত্র এবং কয়েকটি মোবাইল নম্বর লেখা একটি কাগজ খুঁজে পান। পরিচয়পত্র থেকে জানা যায়, আহত ব্যক্তির নাম মো. মাসুদ আলম। তার বাড়ি নীলফামারী সদর উপজেলার কানিয়ালখাতা গ্রামে।

পরে কাগজে থাকা মোবাইল নম্বরগুলোতে যোগাযোগ করে গভীর রাতেই পরিবারের সদস্যদের কাছে দুর্ঘটনার খবর পৌঁছে দেন আনসার সদস্যরা।

রাত প্রায় পৌনে ১টার দিকে হাসপাতালে ছুটে আসেন মাসুদ আলমের ছেলে মাহিন ইসলাম ও ভাগ্নে সাকিব ইসলাম। দীর্ঘ সময় ধরে অপেক্ষায় থাকা আনসার সদস্যরা স্বজনদের হাতে অক্ষত অবস্থায় উদ্ধারকৃত মানিব্যাগ, নগদ ৮ হাজার টাকা এবং অন্যান্য ব্যক্তিগত সামগ্রী বুঝিয়ে দেন। একই সঙ্গে চিকিৎসাধীন মাসুদ আলমকে পরিবারের জিম্মায় হস্তান্তর করা হয়।

বর্তমানে মাসুদ আলম হাসপাতালের সার্জারি ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। চিকিৎসকদের মতে, তিনি এখন আশঙ্কামুক্ত এবং আগের তুলনায় অনেকটাই সুস্থ।

বাবার দুর্ঘটনার খবর পেয়ে হাসপাতালে ছুটে আসা মাহিন ইসলাম আবেগাপ্লুত কণ্ঠে বলেন, “গভীর রাতে আনসার সদস্যরা যেভাবে আমার বাবার পাশে দাঁড়িয়েছেন, চিকিৎসার ব্যবস্থা করেছেন এবং তার টাকা-পয়সা নিরাপদে সংরক্ষণ করেছেন, তা সত্যিই প্রশংসার দাবিদার। তাদের এই মানবিকতা আমরা কখনো ভুলব না।”

বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর সদস্যরা শুধু নিরাপত্তা দায়িত্বই নয়, বিভিন্ন দুর্যোগ, দুর্ঘটনা ও সামাজিক সংকটে মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছেন। নীলফামারী সদর হাসপাতালের এই ঘটনাও তাদের সেই মানবিক ও সেবামূলক কর্মকাণ্ডের একটি উজ্জ্বল উদাহরণ হিসেবে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।

ফেসবুকে আমরা

মন্তব্য করুন

guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted

সর্বাাধিক পঠিত নিউজ

Scroll to Top