১৯শে জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ৫ই আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ | ৪ঠা মহর্‌রম, ১৪৪৮ হিজরি

সংসদে ‘শহীদের সন্তান’ দাবি জামায়াত এমপি আব্দুল মুনতাকিমের পিতা জীবিত

মো. সাইফুল ইসলাম, নীলফামারী প্রতিনিধি:

জাতীয় সংসদে দাঁড়িয়ে নিজেকে মুক্তিযুদ্ধে শহীদের সন্তান হিসেবে উপস্থাপন করে ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়েছেন নীলফামারী-৪ (সৈয়দপুর-কিশোরগঞ্জ) আসনের জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য আব্দুল মুনতাকিম। তার দেওয়া বক্তব্যের সঙ্গে নির্বাচনী হলফনামা ও পারিবারিক তথ্যের অসঙ্গতি প্রকাশ্যে আসার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে।

গত রোববার জাতীয় সংসদের বাজেট অধিবেশনে বক্তব্য প্রদানকালে আব্দুল মুনতাকিম বলেন, “আমার বাবা, আমার দাদা যুদ্ধে শহীদ। আমার আব্বারা ৭ ভাই, ৪ জন মুক্তিযোদ্ধা। আমার দাদারা ১৯ জন, ১১ জন মুক্তিযোদ্ধা। আমার মা মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক।”

তার এই বক্তব্য সংসদে প্রচারিত হওয়ার পরপরই বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। কারণ নির্বাচন কমিশনে দাখিল করা তার হলফনামা অনুযায়ী, আব্দুল মুনতাকিমের জন্ম ১৯৮১ সালের ১০ জানুয়ারি। অর্থাৎ মহান মুক্তিযুদ্ধের প্রায় এক দশক পর তার জন্ম। ফলে একজন ব্যক্তি কীভাবে একইসঙ্গে মুক্তিযুদ্ধে শহীদ পিতার সন্তান হওয়ার দাবি করেন, তা নিয়ে জনমনে বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয়।

হলফনামার তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, সর্বশেষ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মনোনয়নপত্র দাখিলের সময় তার বয়স ছিল ৪৪ বছর ১১ মাস ২০ দিন। অন্যদিকে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, তার বাবা আব্দুল কাদের সৈয়দী ও মা মোসলমান বেগম বর্তমানে জীবিত রয়েছেন এবং সৈয়দপুর উপজেলার কামারপুকুর ইউনিয়নের ধলাগাছ গ্রামে বসবাস করছেন।

স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, রাজনীতিতে সক্রিয় হওয়ার আগে আব্দুল মুনতাকিম দীর্ঘদিন সৈয়দপুরের আল ফারুক একাডেমিতে শিক্ষকতা করেছেন। পরে তিনি জামায়াতে ইসলামীর রাজনীতিতে সক্রিয় হয়ে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।

সংসদে দেওয়া বক্তব্যের বিষয়ে জানতে চাইলে আব্দুল মুনতাকিম বিষয়টিকে অনিচ্ছাকৃত ভুল হিসেবে উল্লেখ করে দুঃখ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, “সংসদে বক্তব্য দিতে গিয়ে অসাবধানতাবশত ভুল তথ্য ও শব্দ উচ্চারিত হয়েছে। এই অনাকাঙ্ক্ষিত ভুলের জন্য আমি আন্তরিকভাবে দুঃখ প্রকাশ করছি।”

তিনি আরও জানান, জাতীয় সংসদের কার্যবিবরণী থেকে ভুল তথ্য সংশোধনের জন্য প্রয়োজনীয় দাপ্তরিক প্রক্রিয়া শুরু করা হয়েছে।

এদিকে সৈয়দপুর উপজেলা জামায়াতের নায়েবে আমির মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, “এটি মূলত ‘স্লিপ অব টাং’ বা মুখ ফসকে বলা একটি ভুল। সংসদ সদস্য বিষয়টি ইতোমধ্যে স্বীকার করেছেন এবং নির্বাচনী এলাকায় ফিরে সংবাদকর্মীদের সামনে বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেবেন।”

তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সচেতন নাগরিকদের একাংশের মতে, দেশের সর্বোচ্চ আইনসভা জাতীয় সংসদে দেওয়া প্রতিটি বক্তব্যই গুরুত্বপূর্ণ এবং রাষ্ট্রীয় নথির অংশ হয়ে থাকে। ফলে একজন সংসদ সদস্যের কাছ থেকে তথ্য উপস্থাপনে অধিক সতর্কতা ও দায়িত্বশীলতা প্রত্যাশিত। বিশেষ করে মুক্তিযুদ্ধের মতো স্পর্শকাতর ও জাতির ইতিহাসের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে বিভ্রান্তিকর তথ্য জনমনে ভুল বার্তা দিতে পারে।

ঘটনার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে। অনেকেই সংসদ সদস্যের বক্তব্যের সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন, আবার কেউ কেউ এটিকে অনিচ্ছাকৃত ভুল হিসেবে দেখার আহ্বান জানিয়েছেন। তবে বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে—মুক্তিযুদ্ধ ও শহীদ পরিবারের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে একজন জনপ্রতিনিধির বক্তব্য কতটা নির্ভুল হওয়া উচিত।

বর্তমানে সংসদ সদস্যের ব্যাখ্যা ও রেকর্ড সংশোধনের উদ্যোগের দিকে নজর রাখছে রাজনৈতিক মহল ও সাধারণ জনগণ।

ফেসবুকে আমরা

মন্তব্য করুন

guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted

সর্বাাধিক পঠিত নিউজ

Scroll to Top