মোঃ আমিরুল হক, রাজবাড়ী প্রতিনিধি:
মাঠজুড়ে সবুজের সমারোহ। পরিশ্রমের প্রতিদান হিসেবে এবার রাজবাড়ীতে পেঁয়াজের বাম্পার ফলন হয়েছে। কিন্তু সেই আনন্দ বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। বাজারে পেঁয়াজের দামে ধস নামায় এখন চরম হতাশায় দিন কাটাচ্ছেন জেলার হাজারো কৃষক। উৎপাদন খরচ বেড়ে গেলেও ন্যায্য মূল্য না পাওয়ায় অনেকেই লোকসানের মুখে পড়েছেন।
মঙ্গলবার (৩০ জুন) সকালে জেলার বালিয়াকান্দি উপজেলার বহরপুর ইউনিয়নের ঐতিহ্যবাহী বহরপুর হাটে গিয়ে পেঁয়াজের করুন দৃশ্য চোখে পড়ে।
জেলার রাজবাড়ী সদর, পাংশা, বালিয়াকান্দি, কালুখালী ও গোয়ালন্দ উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় কয়েকজন কৃষকের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এবার অনুকূল আবহাওয়া ও পরিচর্যার কারণে পেঁয়াজের ফলন ভালো হয়েছে। তবে একসঙ্গে বাজারে বিপুল পরিমাণ পেঁয়াজ ওঠায় দাম দ্রুত কমে গেছে। বর্তমানে স্থানীয় হাট-বাজারে প্রতি কেজি পেঁয়াজ ১৫ থেকে ২০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। অথচ কৃষকদের দাবি, বীজ, সার, কীটনাশক, সেচ ও শ্রমিকের মজুরিসহ সব মিলিয়ে উৎপাদন খরচ বিবেচনায় কমপক্ষে ৪৫ থেকে ৫০ টাকা কেজি দাম না পেলে লাভ তো দূরের কথা, খরচই ওঠে না।
স্থানীয় কৃষক মোঃ মোতাহার হোসেন বলেন, “এবার পেঁয়াজের ভালো ফলন হলেও বাজারে ন্যায্য দাম না থাকায় আমরা চরম লোকসানের মুখে পড়েছি। উৎপাদন খরচই উঠছে না। ঋণ করে চাষ করেছি, এখন সেই টাকা পরিশোধ করাও কঠিন হয়ে পড়েছে।”
কৃষক মোঃ কামরুল ইসলাম বলেন, “বীজ, সার, কীটনাশক ও শ্রমিকের খরচ অনেক বেড়েছে। কিন্তু বাজারে পেঁয়াজের দাম এত কম যে বিক্রি করে লাভ তো দূরের কথা, খরচই তুলতে পারছি না। সরকার যদি ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করত, তাহলে কৃষকরা কিছুটা স্বস্তি পেত।”
কৃষক সুজন শেখ বলেন, “আমরা অনেক আশা নিয়ে পেঁয়াজের আবাদ করেছিলাম। কিন্তু বর্তমান বাজারদরে পেঁয়াজ বিক্রি করে পরিবার চালানোই কঠিন হয়ে গেছে। কৃষকদের স্বার্থে দ্রুত বাজার স্থিতিশীল করা এবং ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ কামনা করছি।”
রাজবাড়ী সদর উপজেলার মিজানপুর ইউনিয়নের কৃষক আব্দুল করিম বলেন, “এবার ফলন খুব ভালো হয়েছে। ভেবেছিলাম লাভ হবে। কিন্তু এখন যে দামে বিক্রি করছি, তাতে ঋণের টাকাও শোধ করতে কষ্ট হবে।”
পাংশা উপজেলার কৃষক রফিকুল ইসলাম বলেন, “এক বিঘা জমিতে পেঁয়াজ চাষ করতে প্রচুর টাকা খরচ হয়েছে। এখন বাধ্য হয়ে কম দামে বিক্রি করতে হচ্ছে। কারণ বেশি দিন সংরক্ষণ করার মতো ব্যবস্থা নেই।”
বালিয়াকান্দির কৃষক মোঃ কাউছার হোসেন বলেন, “কৃষকের ঘাম ঝরিয়ে উৎপাদিত ফসলের ন্যায্য দাম না থাকলে কৃষি করে টিকে থাকা কঠিন হয়ে যাবে।”
স্থানীয় পাইকারি ব্যবসায়ীরা জানান, জেলার পাশাপাশি দেশের অন্যান্য এলাকা থেকেও বাজারে প্রচুর পেঁয়াজ আসছে। ফলে সরবরাহ বেড়ে যাওয়ায় দাম কমেছে। বাজারে চাহিদার তুলনায় সরবরাহ বেশি থাকায় আপাতত মূল্য বৃদ্ধির সম্ভাবনাও কম।
কৃষি সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কৃষকদের জন্য আধুনিক সংরক্ষণাগার, সহজ ঋণ সুবিধা এবং কার্যকর বাজার ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা গেলে এ ধরনের সংকট অনেকটাই কমানো সম্ভব। পাশাপাশি মধ্যস্বত্বভোগীদের নিয়ন্ত্রণ ও কৃষকের কাছ থেকে সরাসরি পণ্য সংগ্রহের উদ্যোগ বাড়ানোরও পরামর্শ দিয়েছেন তারা।
জেলার পেঁয়াজ চাষিদের দাবি, সরকার দ্রুত ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করুক। তা না হলে লোকসানের কারণে আগামী মৌসুমে অনেক কৃষক পেঁয়াজ চাষ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতে পারেন। এতে ভবিষ্যতে উৎপাদন কমে যাওয়ার পাশাপাশি বাজারেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।