মো. সাইফুল ইসলাম, নীলফামারী প্রতিনিধি:
নীলফামারীর কিশোরগঞ্জ উপজেলায় সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে এক সাংবাদিকের ওপর হামলার অভিযোগকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা ছড়িয়েছে। তবে ঘটনাটির অনুসন্ধানে উঠে এসেছে আরও বিস্তৃত প্রেক্ষাপট। সরকারি খাসজমি নিয়ে দীর্ঘদিনের বিরোধ, বাজার ব্যবস্থাপনা, রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব, পাল্টাপাল্টি মামলা এবং প্রশাসনিক তদন্ত—সব মিলিয়ে বিষয়টি এখন জটিল রূপ নিয়েছে।
সরেজমিন পরিদর্শন, ভিডিওচিত্র ধারণ, সরকারি ভূমি রেকর্ড যাচাই এবং মামলার উভয় পক্ষ, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, ব্যবসায়ী, প্রত্যক্ষদর্শী, ভূমি কর্মকর্তা ও প্রশাসনের সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে এ প্রতিবেদন প্রস্তুত করা হয়েছে।
উপজেলা ভূমি অফিসের নথি অনুযায়ী, কিশোরগঞ্জ বাজার মৌজার বিএস ১ নম্বর খাস খতিয়ানের ৩৬০০ থেকে ৩৬০৬ নম্বর দাগভুক্ত প্রায় ২ একর ৬৭ শতক জমি সরকারি খাসজমি হিসেবে রেকর্ডভুক্ত। দীর্ঘদিন ধরে ওই জমিতে অসংখ্য ব্যবসায়ী দোকান নির্মাণ করে ব্যবসা পরিচালনা করছেন। ভূমি অফিসের রেকর্ড পর্যালোচনায় এ তথ্যের সত্যতা মিলেছে।
স্থানীয় সূত্র জানায়, সরকারি খাসজমি উদ্ধার ও বন্দোবস্তের দাবিতে জেলা প্রশাসকের কাছে অভিযোগ দেওয়ার পর প্রশাসন তদন্ত শুরু করে। এ বিষয়ে সংবাদ সংগ্রহ করতে ঘটনাস্থলে যান চ্যানেল ওয়ানের নীলফামারী জেলা প্রতিনিধি মো. আবু সাঈদ অপু। এ সময় উপস্থিত কয়েকজনের মধ্যে বাকবিতণ্ডা ও ধাক্কাধাক্কির ঘটনা ঘটে। পরে সাংবাদিক আহত হওয়ার অভিযোগ তুলে চিকিৎসা নেন।
ঘটনার পর স্থানীয় বিএনপি নেতা মিনারুল ইসলাম কিশোরগঞ্জ সদর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী (গ্রেনেড বাবু)সহ ছয়জনের বিরুদ্ধে মামলা করেন।
অন্যদিকে আল-আমিন নামে এক ব্যক্তি মিনারুল ইসলামসহ পাঁচজনের বিরুদ্ধে পৃথক মামলা দায়ের করেন। দুটি মামলাই বর্তমানে তদন্তাধীন রয়েছে।
চেয়ারম্যান হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী দাবি করেন, ঘটনার সময় তিনি রংপুরে ছিলেন এবং ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন না। রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারণেই তাকে মামলায় জড়ানো হয়েছে বলে তিনি অভিযোগ করেন। একই সঙ্গে তিনি বলেন, সরকারি খাসজমি উদ্ধার করা হলে দীর্ঘদিনের ব্যবসায়ীদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা উচিত।

মামলার বাদী মিনারুল ইসলাম বলেন, সরকারি সম্পত্তি দখল এবং সাংবাদিকের ওপর হামলার অভিযোগে মামলা করা হয়েছে। তবে বর্তমানে উভয় পক্ষের মধ্যে আলোচনা চলছে এবং তিনি নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে ন্যায়বিচার প্রত্যাশা করেন।
অপর মামলার বাদী আল-আমিনের অভিযোগ, ঘটনাস্থলে প্রতিবাদ করায় তাকে ও তার সহযোগীদের মারধর করা হয়। এ কারণেই তিনি পাল্টা মামলা করেছেন।
ঘটনাস্থলে উপস্থিত কয়েকজন প্রত্যক্ষদর্শী জানান, সেখানে মূলত স্থানীয়দের মধ্যে বাকবিতণ্ডা হয়েছিল। সাংবাদিককে লক্ষ্য করে পরিকল্পিত হামলার ঘটনা তারা প্রত্যক্ষ করেননি। তবে সাংবাদিক আহত হওয়ার বিষয়টি মামলায় উল্লেখ থাকায় প্রকৃত ঘটনা তদন্তের মাধ্যমেই নিশ্চিত হবে বলে তারা মনে করেন।
বাজারের একাধিক ব্যবসায়ী জানান, তারা কয়েক দশক ধরে ওই সরকারি খাসজমিতে ব্যবসা করে জীবিকা নির্বাহ করছেন। সরকার জমি উদ্ধার করলে পুনর্বাসন অথবা বৈধ লিজের ব্যবস্থা করার দাবি জানান তারা। অন্যথায় বহু পরিবার জীবিকার সংকটে পড়বে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন।
কিশোরগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. লুৎফর রহমান বলেন, একই ঘটনায় দুটি মামলা হয়েছে। উভয় মামলার তদন্ত চলছে এবং তদন্ত শেষে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. আরিফুর রহমান বলেন, বিষয়টি তদন্তাধীন থাকায় এ মুহূর্তে বিস্তারিত মন্তব্য করা সমীচীন নয়।
জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ নায়িরুজ্জামান জানান, ঘটনাটি তদন্তে পাঁচ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পর তা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে এবং সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী পরবর্তী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
অনুসন্ধানে প্রাপ্ত তথ্য, সরকারি নথিপত্র এবং সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য বিশ্লেষণে প্রতীয়মান হয়েছে, ঘটনাটি শুধু সাংবাদিকের ওপর হামলার অভিযোগে সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে সরকারি খাসজমির ব্যবহার, দীর্ঘদিনের বাজার পরিচালনা, স্থানীয় রাজনৈতিক বিরোধ এবং প্রশাসনিক তদন্তের বিষয়গুলোও জড়িত। তবে হামলার অভিযোগসহ সব অভিযোগের সত্যতা এখনও তদন্তাধীন। তদন্ত শেষ হওয়ার পরই ঘটনার প্রকৃত চিত্র স্পষ্ট হবে।