জন্মতারিখ সংশোধনে ঢাকামুখী ভোগান্তি, অ্যাপয়েন্টমেন্ট সফটওয়্যার চালুর চিন্তা ইসির

নিজস্ব প্রতিনিধি:

ছবিসহ জাতীয় পরিচয়পত্রের (এনআইডি) জন্মতারিখসহ গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সংশোধনের ‘ঘ’ ক্যাটাগরির আবেদন নিষ্পত্তির ক্ষমতা এখন নির্বাচন কমিশনের (ইসি) কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে সীমাবদ্ধ। মাঠপর্যায়ে দুর্নীতি ও অনিয়ম ঠেকানোর যুক্তিতে এ ক্ষমতা ঢাকাকেন্দ্রিক করায় দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে সেবাপ্রত্যাশীদের রাজধানীতে ছুটতে হচ্ছে। এতে বাড়ছে সময়, অর্থ ও ভোগান্তি।

টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়াসহ দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে প্রতিদিন হাজারো মানুষ এনআইডির জন্মতারিখ সংশোধনের আবেদন নিয়ে রাজধানীর আগারগাঁওয়ে নির্বাচন ভবনে আসছেন। তবে সেখানে গিয়েও অনেককে কাঙ্ক্ষিত সেবা পেতে দীর্ঘ অপেক্ষা করতে হচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে, এ সুযোগে দালালচক্রও সক্রিয় হয়ে উঠেছে। ফলে অনেক আবেদনকারী আর্থিক ক্ষতির পাশাপাশি নথিপত্রের অসংগতি ও তথ্যগত জটিলতায় পড়ছেন।

এই পরিস্থিতি সামাল দিতে ‘ঘ’ ক্যাটাগরির আবেদন গ্রহণ ও শুনানির জন্য অ্যাপয়েন্টমেন্টভিত্তিক সফটওয়্যার চালুর উদ্যোগ নিচ্ছে নির্বাচন কমিশন। প্রাথমিকভাবে সকাল ১০টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত আবেদনকারীদের শুনানি নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। বিষয়টি নিয়ে কমিশন পর্যায়ে একটি কর্মশালা আয়োজনের কথাও ভাবা হচ্ছে।

ইসি সূত্র জানায়, প্রতিদিন গড়ে প্রায় এক হাজার ‘ঘ’ ক্যাটাগরির আবেদন জমা পড়ছে। বর্তমানে এ ধরনের অনিষ্পন্ন আবেদনের সংখ্যা প্রায় ৮০ হাজার। গত সপ্তাহে একদিনে প্রায় ৩০০ সেবাপ্রত্যাশীর সঙ্গে কথা বলতে হয়েছে মাত্র ১২ থেকে ১৩ জন কর্মকর্তাকে। এ চাপ কমাতেই অ্যাপয়েন্টমেন্টভিত্তিক ব্যবস্থা চালুর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

নির্বাচন কমিশনের সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ বলেন, জন্মতারিখ সংশোধনের ক্ষমতা মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের দেওয়ার পরিকল্পনা নেই। তার মতে, একজন ব্যক্তির একাধিক জন্মতারিখ থাকা গ্রহণযোগ্য নয় এবং অনেক আবেদনেই অস্বাভাবিক তথ্য পাওয়া যাচ্ছে।

তিনি বলেন, এমন আবেদনও এসেছে যেখানে সংশোধন অনুমোদন হলে আবেদনকারীর বয়স অস্বাভাবিকভাবে কমে যাবে। আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে মৃত বাবার মৃত্যুর বহু মাস পর বয়স সংশোধনের আবেদন জমা দেওয়া হয়েছে। এসব কারণে জন্মতারিখ সংশোধনের আবেদন যাচাইয়ে কঠোরতা বজায় রাখা প্রয়োজন।

এর আগে জন্মতারিখ সংশোধনের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট সীমা পর্যন্ত ক্ষমতা আঞ্চলিক ও জেলা পর্যায়ের কর্মকর্তাদের হাতে ছিল। বড় ধরনের সংশোধনের আবেদন এনআইডি মহাপরিচালক, ইসি সচিবালয় বা কমিশনের অনুমোদনের জন্য পাঠানো হতো। তবে সাম্প্রতিক সময়ে মাঠপর্যায়ের সেই ক্ষমতা গুটিয়ে নেওয়ায় নির্বাচন ভবনে মানুষের চাপ বেড়েছে।

এনআইডি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক মানুষ সরাসরি কার্যালয়ে এসে নানা ধরনের আবেদন ও অনুরোধ করছেন। অনেকেই প্রয়োজনীয় নথি ছাড়া জন্মতারিখ পরিবর্তনের দাবি জানাচ্ছেন। ফলে নথিপত্র যাচাই ও নিয়মিত প্রশাসনিক কাজ ব্যাহত হচ্ছে।

কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, কিছু আবেদন এতটাই অসংগতিপূর্ণ যে সেগুলো অনুমোদন করা সম্ভব নয়। এক ঘটনায় এক নারী নিজের জন্মসাল পরিবর্তন করতে আবেদন করেন, কিন্তু নথিপত্রে দেখা যায় তার মেয়ের জন্মসাল তার প্রস্তাবিত জন্মসালের আগের। আরেক ঘটনায় এক ব্যক্তি বয়স কয়েক দশক কমানোর আবেদন করেন, যদিও তার পক্ষে প্রয়োজনীয় দলিল উপস্থাপন করা সম্ভব হয়নি।

এদিকে, আবেদন নিষ্পত্তির কাজে অতিরিক্ত কর্মকর্তা নিয়োগের একটি প্রস্তাব উঠলেও তা অনুমোদন হয়নি বলে জানা গেছে। ইসির একাংশ মনে করছে, জবাবদিহিতা ও নজরদারি নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ সংশোধনী আবেদনগুলো কেন্দ্রীয়ভাবে নিষ্পত্তি করা প্রয়োজন। তবে কমিশনের অন্য অংশ মাঠপর্যায়ে সীমিত ক্ষমতা ফিরিয়ে দেওয়ার পক্ষে মত দিয়েছে।

নির্বাচন কমিশনার আবদুর রহমানেল মাছউদ বলেন, এনআইডি সংশোধন নিয়ে বর্তমানে এক ধরনের বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়েছে। এ বিষয়ে নীতিমালা সংশোধনের একটি প্রস্তাব কমিশনের কাছে এসেছে এবং তা যাচাই করা হচ্ছে। মানুষের ভোগান্তি কমাতে শিগগিরই যৌক্তিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলে তিনি জানান।

ইসি জানিয়েছে, অ্যাপয়েন্টমেন্ট সফটওয়্যার চালু হলে আবেদনকারীরা নির্ধারিত সময় অনুযায়ী নির্বাচন ভবনে এসে শুনানিতে অংশ নিতে পারবেন। এতে অনিয়ন্ত্রিত ভিড় কমবে এবং সেবা ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা ফিরবে বলে আশা করছে কমিশন।

ফেসবুকে আমরা

মন্তব্য করুন

guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted

সর্বাাধিক পঠিত নিউজ

Scroll to Top