মোঃ আমিরুল হক, রাজবাড়ী প্রতিনিধি:
রিমান্ডে নিয়ে নন জুডিসিয়াল সাদা স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর করিয়ে নিয়ে এক নারী আইনজীবিকে ধর্ষণের চেষ্টা ও তার কাছে ৩০ লক্ষ টাকা চাঁদা দাবীর ঘটনায় পুলিশের এক সাব ইনস্পেক্টর (এস,আই) বা (দারোগা) সহ ৫ জনের বিরুদ্ধে দায়েরকৃত মামলা পুনঃ তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন আদালত।
বুধবার (২৯ এপ্রিল) রাজবাড়ীর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্রুনালে ভুক্তভোগী ওই নারী আইনজীবীর আবেদনের প্রেক্ষিতে আদালত এ আদেশ দেন। এর আগে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা রাজবাড়ী সদর থানার এস.আই মোঃ আসাদুজ্জামান মামলায় অভিযুক্ত সকল আসামীকে অব্যাহতি দিয়ে আদালতে চুড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করেন।
নারী আইনজীবীর দায়ের করা মামলায় অভিযুক্ত আসামীরা হলো, রাজশাহী মহানগরের চন্দ্রিমা থানার ছোট বনগ্রামের মৃত ইমাম শেখের ছেলে শেখ আব্দুল্লাহ, রাজশাহীর চরঘাট থানার চকবেলঘরিয়া গ্রামের লুৎফর রহমানের ছেলে ও রাজশাহী আরএমপি বোয়ালিয়া থানার প্রাক্তন সাব ইন্সপেক্টর (এস,আই) ও ডিবি ডিএমপিতে কর্মরত মোঃ মাহফুজুর রহমান, লালমনিরহাট জেলার আদিতমারী থানার আদিতমারী গ্রামের মোঃ ওয়াহিদ উল আলমের ছেলে ও বর্তমান রাজশাহী শাহমখদুম থানার শাহমখদুম এলাকার বাসিন্দা মোঃ জাহিদ উল আলম, রাজশাহীর রাজপাড়া থানার চন্ডিপুর গ্রামের মোঃ শাহিন ইসলাম মোল্লার ছেলে রোমান ইসলাম ও মোঃ আব্দুস ছালাম।
মামলার অভিযোগে প্রকাশ, ২০২৪ সালের ১ এপ্রিল দুপুর দেড়টা থেকে আড়াই টার দিকে রাজবাড়ী জেলা পরিষদ ডাক বাংলোর সামনে ট্রাফিক আইল্যান্ডের নিকট অভিযুক্ত আসামী দারোগা মাহফুজ একটি সৃজিত মামলায় ওই নারী আইনজীবীকে গ্রেপ্তার করে। পরবর্তীতে ওইদিন রাত ৩ টা থেকে সাড়ে ৩ টার সময়ে (২ এপ্রিল) নারী আইনজীবিকে নিয়ে এসআই মাহফুজ রাজশাহী জেলার বোয়ালিয়া থানায় পৌঁছায়। যাবার পর থানায় একটি কক্ষে ওই নারী আইনজীবীকে আটক রাখা হয়। পরে তাকে আদালতে পাঠানো হয়। আদালতে পুলিশ রিমান্ড আবেদন করায় রাজশাহী মেট্রেপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালত তাকে তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।
এসআই মাহফুজুর রহমান ২০২৪ সালের ১৬ এপ্রিল থেকে ১৮ এপ্রিল পর্যন্ত রিমান্ডে এনে নারী আইনজীবিকে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করতে শুরু করে। রিমান্ডের সময় অন্য কোন সাধারণ লোকজন রিমান্ড কক্ষে উপস্থিত না থাকার এবং এর আইনুনানুগ সুযোগ না থাকা সত্ত্বেও এসআই মাহফুজুর রহমান অন্যায় ভাবে রিমান্ডে নিয়ে রিমান্ডের কক্ষে শেখ আব্দুল্লাহ, জাহিদ উল আলম, রোমান ইসলাম ও মোঃ আব্দুস ছালামকে রিমান্ডস্থলে রাখে।
অভিযোগ রয়েছে, রিমান্ড চলাকালীন সময়ে থানা হাজতে ওই আইনজীবীকে আটকে রেখে এসআই মাহফুজ সহ অন্যরা ১০০ টাকা মূল্যের তিনটি নন জুডিসিয়াল সাদা স্ট্যাম্পে জীবননাশের হুমকি প্রদান করে এবং নানারুপ ভাবে ভয়ভীতি প্রদর্শন করে জোরপূর্বক স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর নেয়। এমনকি তার নিকট ৩০ লক্ষ টাকা চাঁদা দাবী করে। এছাড়া রাজবাড়ী থেকে গ্রেফতার করে গভীর রাতে মাইক্রোবাসে রাজশাহী নিয়ে যাওয়ার পথে এসআই মাহফুজুর সহ অন্য আসামীরা ওই আইনজীবীর সাথে অশালীন আচরণ ও ধর্ষণের চেষ্টা চালায়।
এ বিষয়ে রাজবাড়ী জেলা বার এ্যাসোসিয়েশনের সদস্য ভুক্তভোগী ওই নারী আইনজীবী নিজে বাদী হয়ে রাজবাড়ীর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে মামলা (মিসপি-৩০/২০২৫) দায়ের করেন। আদালত মামলাটি গ্রহণ পূর্বক অভিযোগটি এফ.আই.আর হিসেবে গণ্য করার জন্য রাজবাড়ী থানার অফিসার ইনচার্জকে নির্দেশ দেন। আদালতের আদেশের প্রেক্ষিতে রাজবাড়ী থানায় ১৭ মার্চ ২০২৫ একটি মামলা (থানার মামলা নং-২৬, জিআর-২৬/২৫) রুজু হয়।
মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা হিসেবে এস.আই (নিরস্ত্র) মোঃ আসাদুজ্জামানকে দায়িত্ব অর্পণ করা হয়।
ভূক্তভোগী আইনজীবীর অভিযোগ, মামলায় পুলিশের একজন সাব-ইনস্পেক্টর আসামী থাকায় তদন্তকারী কর্মকর্তা এসআই (নিরস্ত্র) মোঃ আসাদুজ্জামান মামলার বাদী ও তার মানীত স্বাক্ষীদের জিজ্ঞাসাবাদ না করেই আসামীদের সাথে যোগসাজশে একতরফাভাবে আদালতে চুড়ান্তভাবে প্রতিবেদন দাখিল করেন।
বুধবার (২৯ এপ্রিল) মামলার বাদী ওই ভুক্তভোগী নারী আইনজীবী রাজবাড়ীর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে সশরীরে উপস্থিত হয়ে তদন্তকারী কর্মকর্তার দাখিলকৃত চুড়ান্ত প্রতিবেদনের বিরুদ্ধে নারাজী রিপোর্ট দাখিল করেন। রাজবাড়ী নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক (জেলা জজ) মোঃ তহিদুল ইসলাম বাদীর দাখিলকৃত নারাজী আবেদন শুনানী শেষে মামলাটি পুনঃ তদন্তের জন্য পুলিশ সুপার, পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) ফরিদপুরকে নির্দেশ দেন।
আদালতে বাদী পক্ষে মামলা পরিচালনা করেন, রাজবাড়ী জেলা বার এসোসিয়েশনের সাবেক সহ-সম্পাদক ও রাজবাড়ী প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি এ্যাডভোকেট খান মোঃ জহুরুল হক। তাকে সহযোগিতা করেন রাজবাড়ী জেলা বার এসোসিয়েশনের সাবেক সাধারণ সম্পাদক এ্যাডভোকেট বিজন কুমার বোস ও এ্যাডভোকেট মোঃ রফিকুল ইসলাম (২)। এছাড়া রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের পাবলিক প্রসিকিউটর মোঃ জাহিদ উদ্দিন মোল্লা।