মো. সাইফুল ইসলাম, নীলফামারী প্রতিনিধি:
দেশে জ্বালানি তেল সরবরাহ ব্যবস্থায় দীর্ঘদিনের অস্থিরতা, অপচয়, অবৈধ মজুদ ও কারসাজি নিয়ন্ত্রণে সরকার চালু করেছে ডিজিটাল ‘ফুয়েল কার্ড’ বা ফুয়েল পাস সিস্টেম। পর্যায়ক্রমে সব ধরনের যানবাহনকে এই ব্যবস্থার আওতায় আনার উদ্যোগের ফলে ইতোমধ্যে জ্বালানি খাতে দৃশ্যমান শৃঙ্খলা ফিরে এসেছে। একই সঙ্গে বেড়েছে বিআরটিএ কার্যালয়ের কার্যক্রম, যানবাহনের বৈধ কাগজপত্র হালনাগাদ এবং সরকারের রাজস্ব আদায়।
নীলফামারী বিআরটিএ কার্যালয় সূত্র জানায়, ফুয়েল কার্ড চালুর ফলে প্রতিটি যানবাহনের জন্য নির্ধারিত পরিমাণ জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা সম্ভব হচ্ছে। কেন্দ্রীয় সার্ভারের মাধ্যমে কোন যানবাহন কতটুকু জ্বালানি গ্রহণ করছে তা পর্যবেক্ষণ করা যাচ্ছে। এতে তেলের অপচয়, অতিরিক্ত বিক্রি, অবৈধ মজুদ ও কালোবাজারি অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণে এসেছে। ফলে জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা বৃদ্ধি পেয়েছে।
নীলফামারী জেলার বিভিন্ন জ্বালানি পাম্পে গিয়ে দেখা গেছে, আগের তুলনায় তেল সংগ্রহে ভোগান্তি কমেছে। আগে দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হলেও বর্তমানে ডিজিটাল কার্ড ও টোকেন ব্যবস্থার কারণে দ্রুত ও সহজে জ্বালানি সংগ্রহ করতে পারছেন চালকরা। এতে যেমন সময় সাশ্রয় হচ্ছে, তেমনি পরিবহন খাতেও ফিরেছে শৃঙ্খলা। পাশাপাশি ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থা চালু হওয়ায় নগদ লেনদেনের ঝুঁকি কমেছে এবং আর্থিক স্বচ্ছতাও বৃদ্ধি পেয়েছে।

জানা যায়, প্রাথমিক পর্যায়ে ফুয়েল কার্ড পেতে গাড়ির বৈধ রেজিস্ট্রেশন, ড্রাইভিং লাইসেন্স, ফিটনেস ও কর পরিশোধ বাধ্যতামূলক করা হয়েছিল। তবে অনেক আবেদনকারী এসব শর্ত পূরণে ব্যর্থ হওয়ায় সরকার পরবর্তীতে কিছু শর্ত শিথিল করে। এতে সাধারণ পরিবহন মালিক ও চালকদের মধ্যে স্বস্তি ফিরে আসে এবং আবেদনকারীর সংখ্যাও দ্রুত বাড়তে থাকে।
তবে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, যারা শুধুমাত্র শোরুম পেপার বা শিক্ষানবীস (লার্নার) লাইসেন্স দিয়ে প্রাথমিকভাবে ফুয়েল কার্ড নিয়েছেন, তাদের নির্ধারিত সময়ের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ রেজিস্ট্রেশন ও বৈধ ড্রাইভিং লাইসেন্স সম্পন্ন করতে হবে। অন্যথায় তাদের ফুয়েল কার্ড বাতিল হতে পারে।
এদিকে, ফুয়েল কার্ড ব্যবস্থার আওতায় আসতে যানবাহনের বৈধ কাগজপত্র বাধ্যতামূলক হওয়ায় নীলফামারীতে গাড়ির মালিক ও চালকদের মধ্যে ড্রাইভিং লাইসেন্স, রেজিস্ট্রেশন ও ফিটনেস নবায়নের প্রবণতা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে জেলা বিআরটিএ কার্যালয়ে।
নীলফামারী বিআরটিএ কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, চলতি বছরের ১ মার্চ থেকে ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত মাত্র দুই মাসে মোটরসাইকেল রেজিস্ট্রেশন হয়েছে ৭৮৪টি। এ খাত থেকে রাজস্ব আদায় হয়েছে প্রায় ৮৭ লাখ ৪১ হাজার ৬০০ টাকা। একই সময়ে শিক্ষানবীস ড্রাইভিং লাইসেন্স ইস্যু করা হয়েছে ৭ হাজার ৪০০টি, যেখান থেকে রাজস্ব আদায় হয়েছে প্রায় ৪৮ লাখ ১০ হাজার টাকা। এছাড়া ফিটনেস নবায়ন, ট্যাক্স টোকেন ও স্মার্টকার্ড সংক্রান্ত কার্যক্রমেও বেড়েছে সেবাগ্রহীতাদের উপস্থিতি।
নীলফামারী বিআরটিএ কার্যালয়ের উপ-পরিচালক (ইঞ্জিঃ) মাহবুবুর রহমান বলেন, “ফুয়েল কার্ড চালুর পর মানুষ এখন নিয়মের মধ্যে আসতে শুরু করেছে। আগে অনেকেই রেজিস্ট্রেশন, ফিটনেস বা লাইসেন্স নবায়নে অনীহা দেখালেও এখন বাধ্য হয়ে বৈধ প্রক্রিয়ায় আসছেন। এর ফলে একদিকে যেমন সরকারের রাজস্ব বাড়ছে, অন্যদিকে সড়কে অবৈধ ও কাগজপত্রবিহীন যানবাহনের চলাচলও কমছে। ভবিষ্যতে এই কার্যক্রম আরও বিস্তৃত হলে পরিবহন ব্যবস্থাপনায় ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে।”
তিনি আরও বলেন, “যারা প্রাথমিকভাবে শিথিল শর্তে ফুয়েল কার্ড নিয়েছেন, তাদের নির্ধারিত সময়ের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ কাগজপত্র সম্পন্ন করতে হবে। অন্যথায় কার্ড বাতিলসহ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
পরিবহন সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ফুয়েল কার্ড ব্যবস্থা শুধু জ্বালানি খাতে শৃঙ্খলা আনেনি, বরং দেশের পরিবহন ব্যবস্থাপনাকে আরও আধুনিক, ডিজিটাল ও নিয়মতান্ত্রিক কাঠামোর আওতায় নিয়ে এসেছে। এর মাধ্যমে একদিকে যেমন সরকারের আয় বাড়ছে, অন্যদিকে জ্বালানি অপচয় ও অবৈধ কার্যক্রমও কমে আসছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘমেয়াদে এই উদ্যোগ দেশের জ্বালানি ব্যবস্থাপনায় ইতিবাচক পরিবর্তনের পাশাপাশি সুশাসন নিশ্চিত করতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।