মো. সাইফুল ইসলাম, নীলফামারী প্রতিনিধি:
নীলফামারীতে ২০২৫ সালে নারী ও শিশুদের বিরুদ্ধে সহিংসতার ঘটনা উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। গত এক বছরে জেলায় মোট ৮১১টি সহিংসতার ঘটনা ঘটলেও এর বিপরীতে মামলা হয়েছে মাত্র ৯৯টি। অর্থাৎ অধিকাংশ ঘটনাই বিচারিক প্রক্রিয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছে, যা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন সংশ্লিষ্টরা।
মঙ্গলবার (১২ মে) দুপুরে নীলফামারী সদর উপজেলা পরিষদের সভাকক্ষে জেন্ডার সমতা ও বৈষম্য নিরসনে নাগরিক সম্পৃক্ততা বিষয়ক ‘ফেসিং’ প্রকল্পের উদ্যোগে আয়োজিত এক পরামর্শ সভায় এসব তথ্য তুলে ধরা হয়। সভায় নারী ও শিশু নির্যাতনের ভয়াবহ চিত্র, বিচারহীনতা এবং সামাজিক প্রতিরোধের দুর্বলতা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়।
উপজেলা নাগরিক প্ল্যাটফর্মের সভাপতি আকতারুল আলম রাজু-এর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভার উদ্বোধন করেন সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মুবাশশিরা আমাতুল্লাহ।
সভায় উপস্থাপিত পরিসংখ্যান অনুযায়ী, মোট ৮১১টি সহিংসতার ঘটনার মধ্যে ৭৯৯টি নারী নির্যাতন এবং ১২টি শিশু নির্যাতনের ঘটনা। এর মধ্যে শারীরিক নির্যাতনের ঘটনা সবচেয়ে বেশি—২২২টি। এছাড়া ভয়ভীতি প্রদর্শন ১১০টি, গৃহ নির্যাতন ৯৫টি, জমিজমা সংক্রান্ত বিরোধ ৭৫টি, আর্থিক নির্যাতন ৫৪টি, যৌতুক সংক্রান্ত নির্যাতন ৫০টি, ধর্ষণচেষ্টা ২৮টি, চুরি ও ছিনতাই ২৩টি, অপহরণ ১৯টি, অনলাইন হয়রানি ১৬টি, ধর্ষণ ৮টি, ইভটিজিং ৬টি এবং অন্যান্য ৬টি ঘটনা রেকর্ড করা হয়েছে।
সভায় স্বাগত বক্তব্য দেন ওয়াজেদ ফিরোজ। তিনি বলেন, “সহিংসতার প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে। অনেক পরিবার সামাজিক লজ্জা, মান-সম্মানের ভয় এবং বিচারপ্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতার কারণে অভিযোগ করতে চায় না।”
ডেমক্রেসিওয়াচের আউটরিচ কো-অর্ডিনেটর আব্দুস সেলিম জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতার সার্বিক চিত্র তুলে ধরে জানান, থানা, আদালত, মহিলাবিষয়ক অধিদপ্তর, ইউনিয়ন পরিষদ, নাগরিক প্ল্যাটফর্ম এবং স্থানীয় সংবাদপত্র থেকে তথ্য সংগ্রহ করে এই প্রতিবেদন প্রস্তুত করা হয়েছে।
তিনি আরও জানান, সদর উপজেলার টুপামারী, গোড়গ্রাম, সংগলশী ও সোনারায় ইউনিয়নকে সহিংসতার দিক থেকে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। বিশেষ করে পারিবারিক সহিংসতা, বাল্যবিবাহ, অনলাইন হয়রানি ও যৌতুকজনিত নির্যাতনের প্রবণতা এসব এলাকায় তুলনামূলক বেশি বলে উল্লেখ করা হয়।
সভায় বক্তারা বলেন, নারীর প্রতি বৈষম্যমূলক সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি, আইনের দুর্বল প্রয়োগ, বিচারপ্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা, মামলার জট, অর্থনৈতিক নির্ভরশীলতা এবং সামাজিক চাপের কারণে নির্যাতনের শিকার অনেক নারী ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। একইসঙ্গে প্রযুক্তির অপব্যবহার ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হয়রানির প্রবণতাও উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে।
বক্তারা নারী ও শিশু নির্যাতন রোধে সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি, পরিবারভিত্তিক মূল্যবোধ শিক্ষা, বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ, নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন, আইনের কঠোর প্রয়োগ এবং স্থানীয় পর্যায়ে দ্রুত প্রতিকার ব্যবস্থার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
সভায় আরও বক্তব্য দেন নীলফামারী থানার পরিদর্শক (তদন্ত) জিল্লুর রহমান, উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা ফিরোজ হোসেন, সাংবাদিক নুর আলম, সদর উপজেলা পরিষদের সাবেক নারী ভাইস চেয়ারম্যান দৌলত জাহান ছবি এবং অ্যাডভোকেট আলপনা রায়। এছাড়াও সরকারি কর্মকর্তা, জনপ্রতিনিধি, নারী উন্নয়নকর্মী ও গণমাধ্যমকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।
সভা শেষে অংশগ্রহণকারীরা জেলায় নারী ও শিশু নির্যাতন প্রতিরোধে সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ, স্থানীয় পর্যায়ে মনিটরিং জোরদার এবং ভুক্তভোগীদের জন্য সহজ আইনি সহায়তা নিশ্চিত করার আহ্বান জানান।