১৩ই মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ৩০শে বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ | ২৬শে জিলকদ, ১৪৪৭ হিজরি

সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক নিয়েও কাটছে না সংকট, আমানত ফেরত না পেয়ে ক্ষুব্ধ গ্রাহকরা

নিজস্ব প্রতিনিধি:

দেশের পাঁচটি দুর্বল শরিয়াভিত্তিক ব্যাংক একীভূত করে গঠিত ‘সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক’ চালু হলেও এখনো স্বস্তি ফেরেনি গ্রাহকদের মধ্যে। বরং আমানতের টাকা তুলতে না পেরে দেশের বিভিন্ন এলাকায় আন্দোলনে নেমেছেন ভুক্তভোগীরা।

চট্টগ্রামের ব্যবসায়ী মোহাম্মদ আবুল কালাম আজাদ জানান, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক ও সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকে তার তিন কোটির বেশি টাকা আটকে আছে। গত প্রায় দুই বছরে তিনি মাত্র সাত লাখ টাকা তুলতে পেরেছেন।

তিনি বলেন, বিভিন্ন ব্যাংক নানা অজুহাত দিচ্ছে। বহুবার আন্দোলন, আবেদন ও কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করেও কোনো সমাধান পাওয়া যাচ্ছে না।

সম্প্রতি চট্টগ্রাম, রাজশাহীসহ বিভিন্ন জেলায় গ্রাহকরা আমানতের অর্থ ফেরতের দাবিতে বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করেছেন। চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জ ও আগ্রাবাদ এলাকায় কয়েকটি ব্যাংক শাখায় তালা ঝুলিয়ে দেওয়ার ঘটনাও ঘটে।

আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর বড় অঙ্কের খেলাপি ঋণের চাপে শরিয়াভিত্তিক কয়েকটি ব্যাংক মারাত্মক সংকটে পড়ে। পরে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে এক্সিম ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক ও এসআইবিএলকে একীভূত করে ‘সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক’ গঠন করা হয়।

তবে অর্থনীতিবিদদের মতে, একীভূতকরণ প্রক্রিয়ায় শুরু থেকেই পরিকল্পনার ঘাটতি ছিল। ফলে কাঙ্ক্ষিত সুফল মিলছে না।

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের সাবেক মহাপরিচালক ড. তৌফিক আহমদ চৌধুরী বলেন, সরকার শুরু থেকেই ভুল কৌশলে এগিয়েছে। সব দুর্বল ব্যাংককে একত্রিত করলেও নতুন পুঁজি বা কার্যকর সংস্কার নিশ্চিত করা যায়নি। এতে পুরো সংস্কার প্রক্রিয়ার ওপর মানুষের আস্থা নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।

এদিকে ‘ব্যাংক রেজল্যুশন আইন ২০২৬’-এর কিছু ধারা নিয়েও বিতর্ক তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে নতুন আইনের ১৮(ক) ধারা ব্যবহার করে পুরোনো মালিকদের ব্যাংকে ফেরার সুযোগ তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছে ব্যাংক মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকস (বিএবি)।

এরই মধ্যে সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক (এসআইবিএল) সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক থেকে বেরিয়ে আবার স্বতন্ত্রভাবে কার্যক্রম পরিচালনার আবেদন করেছে। এতে পুরো একীভূতকরণ উদ্যোগের ভবিষ্যৎ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

বিআইবিএমের অধ্যাপক ড. আহসান হাবীব বলেন, এক ব্যাংকের ৯০ শতাংশ খেলাপি ঋণ আর অন্য ব্যাংকের ৪০ শতাংশ খেলাপি ঋণ থাকলে উভয়ের স্বার্থ এক হয় না। ফলে সমন্বয় সংকট তৈরি হওয়াই স্বাভাবিক।

২০২৫ সালের ডিসেম্বরে পাঁচ ব্যাংক একীভূত হওয়ার সময় তাদের মোট ঋণের পরিমাণ ছিল প্রায় ১ লাখ ৯৬ হাজার কোটি টাকা। খেলাপি ঋণের হার ছিল ৪৮ থেকে ৯৭ শতাংশ পর্যন্ত।

বাংলাদেশ ব্যাংক অবশ্য এখনই এই উদ্যোগ ব্যর্থ হওয়ার আশঙ্কা দেখছে না। তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান জানিয়েছেন, এখনো উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়নি এবং নতুন বিনিয়োগকারীরাও আগ্রহ দেখাচ্ছেন না।

বিশেষজ্ঞদের মতে, গ্রাহকদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে দ্রুত সুশাসন নিশ্চিত করা, কার্যকর তদারকি বৃদ্ধি এবং আমানত ফেরতের বাস্তবসম্মত ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরি।

ফেসবুকে আমরা

মন্তব্য করুন

guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments

সর্বাাধিক পঠিত নিউজ

Scroll to Top