রবিউল ইসলাম বাবুল, রংপুর বিভাগীয় প্রতিনিধিঃ
লালমনিরহাটের তিস্তা নদীতে নির্বিচারে অবৈধ বালু উত্তোলনের মাশুল দিতে হলো দুটি তাজা প্রাণকে। নদী থেকে বালু উত্তোলন করা নিষিদ্ধ। অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের বিপজ্জনক গভীর গর্তে পড়ে পানিতে ডুবে প্রাণ হারিয়েছে দুই আপন ভাই।
এই মর্মান্তিক ঘটনাটি ঘটেছে শনিবার (১৬ মে) দুপুরে, সদর উপজেলার রাজপুর ইউনিয়নের সলেডি স্প্যার বাঁধ সংলগ্ন তিস্তা নদী এলাকায়।
নিহত দুই ভাই হলো সিফাত আহমেদ (১৮) ও স্বচ্ছ আহমেদ (১৪)। তারা লালমনিরহাট ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষার্থী এবং স্থানীয় খলাইঘাট নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক রেজাউল ইসলামের সন্তান।
একই সাথে দুই সন্তানের এমন আকস্মিক মৃত্যুতে পুরো পরিবার ও এলাকায় নেমে এসেছে গভীর শোকের ছায়া।
স্থানীয় বাসিন্দা ও প্রত্যক্ষদর্শীদের সূত্রে জানা গেছে, শনিবার সকালে দুই ভাই তাদের বন্ধুদের সাথে বাড়ির কাছেই তিস্তা নদীর চরের খোলা মাঠে খেলাধুলা করতে যায়। খেলা শেষে দুপুরের দিকে তারা নদীতে গোসল করতে নামে। এ সময় ছোট ভাই স্বচ্ছ নদীগর্ভের এমন একটি স্থানে পা দেয়, যেখানে অবৈধভাবে বালু তোলার কারণে বিশাল ও গভীর গর্তের সৃষ্টি হয়েছিল। মুহূর্তের মধ্যেই স্বচ্ছ সেই গভীর পানির নিচে তলিয়ে যেতে থাকে।
ছোট ভাইকে ডুবতে দেখে বড় ভাই সিফাত নিজেকে স্থির রাখতে পারেনি। ভাইকে বাঁচানোর আপ্রাণ চেষ্টায় সে তাৎক্ষণিক নদীতে ঝাঁপ দেয়। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত, গর্তের গভীরতা ও পানির তীব্র ঘূর্ণনে সিফাতও নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে এবং দুজনই একসাথে নিখোঁজ হয়।
বেশ কিছুক্ষণ পর তাদের সাথে থাকা অন্যান্য সহপাঠী ও স্থানীয় লোকজন বিষয়টি টের পেয়ে নদীতে তল্লাশি শুরু করেন। দীর্ঘ চেষ্টার পর দুই ভাইকে অচেতন অবস্থায় উদ্ধার করে দ্রুত লালমনিরহাট সদর হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। তবে হাসপাতালে পৌঁছানোর পর কর্তব্যরত চিকিৎসকরা অত্যন্ত দুঃখের সাথে তাদের মৃত ঘোষণা করেন।
লালমনিরহাট সদর হাসপাতালের মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডা. মো. সোয়াদ সংবাদমাধ্যমকে জানান”হাসপাতালে নিয়ে আসার আগেই দুই কিশোরের মৃত্যু হয়েছিল। অতিরিক্ত পানি পেটে চলে যাওয়া এবং শ্বাসরোধ হওয়ার কারণেই মূলত তাদের মৃত্যু ঘটে।”
রাজপুর ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য ডাব্লিউ অধিকারী এই দুর্ঘটনার জন্য সরাসরি নদীতে চলমান অবৈধ বালু উত্তোলনকে দায়ী করেছেন।
তিনি বলেন, প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিয়ে বা নিয়ম অমান্য করে যারা নদীতে এভাবে বড় বড় গর্ত করে বালু তোলে, তাদের কারণেই আজ দুটি মায়ের কোল খালি হলো। এই বিপজ্জনক গর্তগুলো নদীর বুকে একেকটি মৃত্যুর ফাঁদ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এ বিষয়ে লালমনিরহাট সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সাদ আহমেদ ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে দৈনিক আমার বাংলাদেশ সাংবাদিক কে জানান, খবর পাওয়ার পরপরই পুলিশ প্রশাসন ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে।
স্কুল পড়ুয়া দুই ভাইয়ের এই মৃত্যুর পেছনে অবৈধ বালু দস্যুদের দায় বা গাফিলতি কতখানি ছিল, তা খতিয়ে দেখতে বিষয়টি গুরুত্বের সাথে তদন্ত করা হচ্ছে বলে তিনি জানান এবং দোষীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও তিনি আশ্বাস দেন।