বার্তা প্রেরক: আদিব হাসান প্রান্ত, সিকৃবি প্রতিনিধি:
বাংলাদেশের ডেইরি খাতে পরিবেশবান্ধব, জলবায়ু সহনশীল ও টেকসই প্রযুক্তি উদ্ভাবনের লক্ষ্যে এক যুগান্তকারী গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনা করছে সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ( সিকৃবি) । ১৮ ই এপ্রিল, আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থা International Centre for Antimicrobial Resistance Solutions (ICARS)-এর অর্থায়নে পরিচালিত “খাদ্যে সিমবায়োটিক সম্পূরক ব্যবহার: সামুদ্রিক শৈবাল ও প্রোপিওনিব্যাকটেরিয়াম থোয়েনি-এর ভূমিকা গবাদিপশুর অন্ত্রজনিত মিথেন নির্গমন হ্রাস, অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স মোকাবিলা এবং পরিবেশগত স্থায়িত্ব নিশ্চিতকরণে” শীর্ষক গবেষণা প্রকল্প নিয়ে সম্প্রতি বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি সফল অংশীজন সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে।
প্রকল্পটির প্রধান গবেষক (পিআই) ডেইরি সায়েন্স বিভাগের অধ্যাপক ড. ফেরদাউস হোসেন। তিনি এই গবেষণার জন্য আইকার্স, ডেনমার্ক থেকে প্রায় ১ কোটি ৩০ লক্ষ টাকার আন্তর্জাতিক গবেষণা অনুদান অর্জন করেছেন, যা দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ভিত্তিক গবেষণায় একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
গবেষণার আওতায় সিলেট ও পটুয়াখালী অঞ্চলের বিভিন্ন ডেইরি খামারে মাঠপর্যায়ে কাজ পরিচালনা করা হচ্ছে। এতে গরুর খাদ্যে সামুদ্রিক শৈবাল ও উপকারী অণুজীব ব্যবহার করে গবাদিপশু থেকে নির্গত মিথেন গ্যাস কমানো, প্রাণির পরিপাক প্রক্রিয়ার উন্নয়ন, দুধের গুণগত মান বৃদ্ধি এবং অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স নিয়ন্ত্রণের সম্ভাবনা যাচাই করা হচ্ছে। পাশাপাশি এই প্রযুক্তি পরিবেশ দূষণ হ্রাস ও নিরাপদ খাদ্য উৎপাদনে কীভাবে ভূমিকা রাখতে পারে, তাও গবেষণায় গুরুত্বের সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।
বর্তমানে প্রকল্পটির অধীনে ২ জন পিএইচডি ফেলো, ৮ জন এমএস ফেলো এবং ৫ জন ডিভিএম শিক্ষার্থী গবেষণা কার্যক্রমে সম্পৃক্ত রয়েছেন। এছাড়া স্থানীয় উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা, ভেটেরিনারি সার্জন এবং মাঠপর্যায়ের প্রাণিসম্পদ কর্মীরাও তথ্য সংগ্রহ, খামারি সচেতনতা বৃদ্ধি ও প্রযুক্তি বাস্তবায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন।
গবেষণার পাশাপাশি অধ্যাপক ড. ফেরদাউস হোসেন ২০২৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের বোস্টন থেকে প্রাপ্ত গবেষণা অনুদানের মাধ্যমে ডেইরি সায়েন্স বিভাগে একটি অত্যাধুনিক আণবিক গবেষণাগার প্রতিষ্ঠা করেন। বর্তমানে ওই গবেষণাগারে আণবিক জীবাণু শনাক্তকরণ, খাদ্য নিরাপত্তা পরীক্ষা, রোগজীবাণুর বৈশিষ্ট্য নির্ণয় এবং অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী জীবাণু বিশ্লেষণের মতো আধুনিক গবেষণা কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। এছাড়াও তিনি বাংলাদেশ খাদ্য নিরাপত্তা কর্তৃপক্ষ অর্থায়িত একটি গবেষণা প্রকল্প এবং বিশ্বব্যাংক–ইউজিসি অর্থায়িত হিট প্রকল্প সফলভাবে পরিচালনা করছেন।
অংশীজন সভায় অংশগ্রহণকারী গবেষক, শিক্ষক, ভেটেরিনারিয়ান, খামারি ও নীতিনির্ধারকরা মত প্রকাশ করেন যে বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলে প্রাকৃতিকভাবে উৎপাদিত সামুদ্রিক শৈবাল ভবিষ্যতে প্রাণিখাদ্য শিল্পে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করতে পারে। এর মাধ্যমে উপকূলীয় অঞ্চলে সামুদ্রিক শৈবাল চাষ, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও প্রাণিখাদ্য শিল্প গড়ে উঠলে হাজার হাজার মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে।
বিশেষজ্ঞরা আরও আশাবাদ ব্যক্ত করেন যে, এ উদ্যোগ গ্রামীণ নারীদের জন্য ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা তৈরিতে সহায়ক হবে এবং আয়বর্ধক কার্যক্রম সম্প্রসারণের মাধ্যমে পরিবারভিত্তিক অর্থনৈতিক উন্নয়নে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে। একইসঙ্গে পরিবেশ দূষণ ও গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন কমিয়ে জলবায়ু সহনশীল ডেইরি খামার ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠায় এ গবেষণা গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে, যা ভবিষ্যতে দেশের নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন, সবুজ অর্থনীতি ও জাতীয় অর্থনৈতিক উন্নয়নে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।