মোঃ নাঈম ইসলাম, গুরুদাসপুর (নাটোর) প্রতিনিধি:
পেশায় তিনি একজন শিক্ষক। অথচ সাবেক স্ত্রীর নগ্ন ছবি ও ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে ছড়িয়ে দেওয়ার হুমকি দিয়েছেন তিনি। এমনকি শিক্ষকতার আড়ালে একাধিক মেয়ের সঙ্গে অনৈতিক কর্মকান্ডে লিপ্ত হয়েছেন ওই শিক্ষক। নিজের সম্মান বাঁচাতে বাধ্য হয়ে গত জানুয়ারী মাসের ৪ তারিখে সার্চ ওয়ারেন্ট চেয়ে কুষ্টিয়া বিজ্ঞ জেলা ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে মামলা দায়ের করেন ওই শিক্ষক হাসিবুলের সাবেক স্ত্রী ভুক্তভোগী মুক্তি খাতুন (২৩)। মামলা নং- ভেরামারা মিস- ২৫/২০২৬। অভিযুক্ত হাসিবুল নাটোরের বড়াইগ্রাম উপজেলার মশিন্দা গ্রামের মারফত আলীর ছেলে এবং গুরুদাসপুর উপজেলার খুবজীপুর বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক।
মামলা সুত্রে জানাযায়, ২০২৪ সালের জুন মাসে কুষ্টিয়া জেলার ভেড়ামারা উপজেলার সাতবাড়িয়া গ্রামের হাবিবুর রহমানের মেয়ে মুক্তির সাথে হাসিবুলের পারিবারিকভাবে বিবাহ হয়। চলতে থাকে তদের দাম্পত্ত জীবন। হাসিবুল কৌশলে তাদের মেলামেশার ব্যক্তিগত ছবি ও ভিডিও ধারন করে তার মোবাইলে সংরক্ষণ করেন। কিছুদিন পর শুরু হয় যৌতুকের জন্য শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন। একপর্যায়ে গত ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসের ১০ তারিখে শারীরিক নির্যাতন করে বাড়ি থেকে বেড় করে দেন স্ত্রী মুক্তিকে। তিনি এসময় বাবার বাড়ি কুষ্টিয়াতে চল যান। এরপর ২০২৬ সালের জানুয়ারী মাসের ২ তারিখে আবার স্বামীর সংসার করতে নাটোরের বড়াইগ্রামের শশুর বাড়িতে আসেন মুক্তি। কিন্তু স্বামী হাসিবুল তার দেনমোহরের টাকা, স্বর্ণালঙ্কার, আসবাবপত্র রেখে তাকে মেরে বাড়ি থেকে আবার বেড় করে দেন এবং বলেন, আর যদি কখনও এখানে আসে বা দেনমোহরের টাকা চায় তাহলে তান নগ্ন ছবি ও ভিডিও সামাজিক যোগযোগ মাধ্যম ফেসবুকে ছড়িয়ে দেওয়ার হুমকি দেন হাসিবুল। নিজের সম্মান বাঁচাতে অবশেষে ২৬ সালের জানুয়ারী মাসের ৪ তারিখে আদালতে মামলা দায়ের করেন মুক্তি। ওই মামলার তদন্ত দেওয়া হয় বড়াইগ্রাম থানার জহুরুল ইসলামকে। জহুরুল ইসলাম ফেব্রুয়ারীর ২ তারিখে হাসিবুলের মোবাইল ফোনটি জব্দ করে আদালতে সোপর্দ করেন। তদন্তে বেড়িয়ে এস হাসিবুলের ভয়াবহ আপত্তিকর কুকর্ম। তার মোবাইল থেকে একাধিক মেয়ের নগ্ন ছবি ও ভিডিও পাওয়া যায়।
ভুক্তভোগী নারীর সাথে কথা বললে বেড়িয়ে আসে চাঞ্চল্যকর কিছু তথ্য। তিনি বলেন তার স্বামী হাসিবুল ইসলাম নাটোরের গুরুদাসপুর উপজেলার খুবজীপুর বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক। শিক্ষকতার আড়ালে বিভিন্ন মেয়ের সাথে অনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে তার। এমনকি একাধিক মেয়ের সাথে সম্পর্কের নগ্ন ছবি ও ভিডিও হাসিবুলের মোবাইলে দেখতে পান তিনি। ওই বিষয়ে মানানিষেধ করলে তার উপর শারীরিক নির্যাতন করত প্রতিনিয়ত। এবিষয়ে তিনি খুবজীপুর বহুমুখি উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আনিছুর রহমানের কাছে বললেও কোনো প্রতিকার পাননি সেসময়। এমনকি হাসিবুল তাকে হুমকি দিত যে, একাধিক মেয়ের সাথে সম্পর্কের কথা যদি অন্য কেউ যানে তাহলে তাকে তালাক দিবে এবং তার নগ্ন ছবি ফেসবুকে ছড়িয়ে দিবে। সবশেষ জানুযারী মাসের ২ তারিখে তাকে কাবিনের টাকা না দিয়ে এবং টাকা পয়সা, স্বার্ণালঙ্কার কেড়ে রেখে তাকে মেরে বাড়ি থেকে বেড় বরে দেয় হাসিবুল। তিনি এর সঠিক বিচার দাবি করেন। তিনি আরোও বলেন ওই স্কুলের ছাত্রীর সাথেও হাসিবুলের অনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে।
সরেজমিনে খুবজীপুর বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ে গিয়ে জানাযায়, হাসিবুললের সাথে একাধিক মেয়ের যে অনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে তা সঠিক। নাম প্রকাশ করতে অনিচ্ছুক এক শিক্ষক বলেন, হাসিবুলের স্ত্রী মুক্তি তার বিষয়ে আমাদের জানিয়েছিল। হাসিবুলকে বেশ কয়েকবার সর্তককরা হয়েছে। এরপরও সে সঠিক পথে আসে নি। তার বিরুদ্ধে সঠিক কোন তথ্য প্রমান না থাকায় কোন পদক্ষেপ নেননি স্কুল কর্তৃপক্ষ।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন অভিভাবক বলেন, একজন শিক্ষক হয়ে যদি এমন অনৈতিক কর্মকান্ডের সাথে যুক্ত হয় তাহলে আমরা কিভাবে আমাদের মেয়েদের ওই স্কুলে পাঠাবো। যেখানে মেয়েদের কোনো নিরাপত্ত নাই। শিক্ষক হাসিবুলের কঠিন শাস্তি হওয়া দরকার।
খুবজীপুর বহুমুখি উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আনিছুর রহমান বলেন, হাসিবুলে অনৈতক কর্মকান্ডের বিষয়ে তিনি জানেন, তার বিরুদ্ধে কোন তথ্য প্রমান না থাকায় কোনো পদক্ষেপ নিতে পারেননি ওই সময়। তবে একজন শিক্ষকের জন্য আমাদের স্কুলের বদনাম হবে তা মেনে নেওয়া হবে না। শিক্ষক হাসিবুলের বিরুদ্ধে অভিযোগ পাওয়ায় প্রাথমিকভাবে তাকে শোকজ করা হয়েছে।
ওই স্কুলে প্রধান শিক্ষকের কক্ষে বসেই হাসিবুলের কাছে এবিষয়ে জানতে চাইলে সে প্রথমে সব কিছু অস্বীকার করেন। তিনি বলেন, আমার সাথে কোন মেয়ের সম্পর্ক নেই। আমার বিরুদ্ধে যে অভিযোগ আনা হয়েছে তা মিথ্যে। তবে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাব দেওয়ার এক পর্যায়ে তার অনৈতিক সম্পর্কের কথা স্বীকার করেন। বলেন দুই একটা বান্ধবী থাকলে একটু আরটু কিছু হয়। তিনি আরোও বলেন মোবাইল ফোন হস্তান্তর করার আগে আমি তো ওইসব ছবি ও ভিডিও ডিলিট করে দিয়েছিলাম। আপনারা তাহলে ওই ছবি ও ভিডিও গুলো কিভাবে পেলেন। এছাড়া আমি আইন মেনে স্ত্রী মুক্তিকে তালাক দিয়েছি।
গুরুদাসপুর উপজেলা মাধ্যমিক অফিসার সেলিম আকতার বলেন, শিকক্ষ হাসিবুলের বিষয়ে এর আগেও এমন অনৈতিক কর্মকান্ডের অভিযোগ শুনেছি। এমন শিক্ষকের শাস্তি হওয়া দরকার। অভিযোগের পেক্ষিতে স্কুলের প্রধান শিক্ষক তাকে প্রাথমিকভাবে শোকজ করেছেন। তদন্ত করে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) ফাহমিদা আফরোজ বলেন, শিক্ষক হাসিবুলের বিষয়ে সাংবাদিক ও স্কুলের প্রধান শিকক্ষকের কাছ থেকে জানতে পেরেছেন। স্কুলের প্রধান শিক্ষক আনিছুর রহমান তাকে প্রাথমিকভাবে শোকজ করেছেন। তদন্ত করে পরবর্তীতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।