১৯শে মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ৫ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ | ২রা জিলহজ, ১৪৪৭ হিজরি

আদালতে ‘প্রক্সি আসামি’ কাণ্ড, হাজতখানায় খুলে গেল রহস্য

মো. সাইফুল ইসলাম, নীলফামারী প্রতিনিধি:

নীলফামারীর কিশোরগঞ্জ আমলি আদালতে ঘটেছে চাঞ্চল্যকর এক ঘটনা। চাঁদাবাজি ও অপহরণ মামলায় প্রকৃত আসামির পরিবর্তে অন্য একজন ব্যক্তি আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে নিজেকে আসামি পরিচয় দেন। তবে আদালতের হাজতখানায় নাম-ঠিকানা যাচাইয়ের সময় বেরিয়ে আসে ‘প্রক্সি আসামি’র রহস্য। ঘটনাটি জানাজানি হলে আদালতপাড়াজুড়ে তীব্র চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়।

আদালত সূত্র ও মামলার এজাহার থেকে জানা যায়, কিশোরগঞ্জ থানার মামলা নং-৯, তারিখ ১৪ অক্টোবর ২০২৫, জি.আর নং-২৭৪/২০২৫ (কিশোরগঞ্জ), পেনাল কোডের ৩৪২/৩৮৬/৩৮৭ ধারায় দায়ের হওয়া মামলায় সোমবার (১৮ মে) অভিযোগপত্র গ্রহণ ও জামিন শুনানির দিন ধার্য ছিল।

মামলার বাদী মো. মনির হোসেন মিয়া (৫৩) চাঁদপুর জেলার মতলব উত্তর উপজেলার নচিন্তপুর গ্রামের বাসিন্দা এবং মেসার্স এম এস কনস্ট্রাকশন অ্যান্ড কোম্পানির স্বত্বাধিকারী। এজাহারে তিনি উল্লেখ করেন, এলজিইডির আওতাধীন প্রায় দুই কোটি টাকার উন্নয়ন প্রকল্পে নীলফামারীর কয়েকজন ব্যক্তি শ্রমিক সরবরাহের দায়িত্বে ছিলেন। কিন্তু তারা শ্রমিকদের প্রায় ১৮ লাখ ৯০ হাজার টাকা বকেয়া রেখে কাজ বন্ধ করে দেন এবং পরবর্তীতে অতিরিক্ত অর্থ দাবি করতে থাকেন।

এজাহারে আরও বলা হয়, ২০২৫ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর শ্রমিক সরবরাহ সংক্রান্ত আর্থিক বিষয় নিয়ে আলোচনার জন্য মনির হোসেন নীলফামারীতে এলে অভিযুক্তরা তাকে কিশোরগঞ্জ উপজেলার নিতাই গাংবের এলাকায় নিয়ে যায়। সেখানে তাকে ও তার এক সহযোগীকে জিম্মি করে ভয়ভীতি দেখিয়ে নগদ ১১ লাখ ৩১ হাজার টাকা এবং চারটি মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নেওয়া হয়।

ঘটনার পর কিশোরগঞ্জ থানায় মামলা দায়ের করা হলে তদন্ত শেষে এসআই আমিনুল ইসলাম অভিযোগের সত্যতা পেয়ে আদালতে চার্জশিট দাখিল করেন।

সোমবার মামলার আসামিরা আইনজীবী মোহাম্মদ মোরসালিন রায়হান (কাকন)-এর মাধ্যমে আদালতে আত্মসমর্পণ করে জামিনের মেয়াদ বৃদ্ধির আবেদন করেন। শুনানি শেষে বিচারক মো. মাহমুদুল হাসান, আমলি আদালত, কিশোরগঞ্জ, নীলফামারী ন্যায়বিচারের স্বার্থে সকল আসামির জামিন আবেদন নামঞ্জুর করে তাদের সি-ডব্লিউ মূলে জেলহাজতে পাঠানোর নির্দেশ দেন।

তবে ঘটনার নাটকীয় মোড় আসে আদালতের হাজতখানায়। আসামিদের নাম-ঠিকানা রেজিস্টারে অন্তর্ভুক্ত করার সময় এক ব্যক্তি কান্নাকাটি শুরু করেন। দায়িত্বরত পুলিশ সদস্যদের জিজ্ঞাসাবাদে তিনি জানান, তার নাম মো. সুমন এবং তিনি এ মামলার আসামি নন। প্রকৃত আসামি তার খালাতো ভাই মো. মাসুদের অনুরোধে তিনি আদালতে ‘প্রক্সি’ হিসেবে দাঁড়িয়েছিলেন।

পরে তাকে পুনরায় আদালতে হাজির করা হলে বিচারকের জিজ্ঞাসাবাদে তিনি বলেন, “আমি এই মামলার কিছুই জানি না। খালাতো ভাইয়ের কথায় সরল বিশ্বাসে আদালতে দাঁড়িয়েছিলাম।”
তবে তার বক্তব্যে অসংগতি ধরা পড়লে আদালত তাকেও জেলহাজতে পাঠানোর নির্দেশ দেন। আদালতের এ সিদ্ধান্তের পর আদালতপাড়ায় ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়।

সংশ্লিষ্টদের মতে, আদালতে ‘প্রক্সি আসামি’ হাজির হওয়ার ঘটনা অত্যন্ত গুরুতর এবং বিচারিক ব্যবস্থার জন্য উদ্বেগজনক।

মামলার বাদী মনির হোসেন মিয়া বলেন, “আসামিরা প্রতারণা ও ভয়ভীতি দেখিয়ে আমার নগদ টাকা ও মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নিয়েছে। এতে আমি ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছি। আমি আদালতের কাছে সুষ্ঠু বিচার প্রত্যাশা করছি।”

আসামিপক্ষের আইনজীবী মোহাম্মদ মোরসালিন রায়হান কাকন বলেন, “আসামিদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী হাজিরা ও জামিন আবেদন প্রস্তুত করা হয়েছিল। আদালত জামিন নামঞ্জুরের পরই আমরা জানতে পারি, মাসুদের পরিবর্তে সুমন আদালতে উপস্থিত ছিলেন।”

বিচারক মামলার পরবর্তী শুনানির জন্য আগামী ২৯ জুলাই ২০২৬ তারিখ নির্ধারণ করেছেন।

ফেসবুকে আমরা

মন্তব্য করুন

guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments

সর্বাাধিক পঠিত নিউজ

Scroll to Top