মো. সাইফুল ইসলাম, নীলফামারী প্রতিনিধি:
তীব্র তাপপ্রবাহ ও ভ্যাপসা গরমে নীলফামারীতে ডায়রিয়া, নিউমোনিয়া, হাঁপানি, জ্বর ও শ্বাসকষ্টজনিত রোগে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হচ্ছে শিশু ও বয়োবৃদ্ধরা। রোগীর অতিরিক্ত চাপে নীলফামারী জেনারেল হাসপাতালের শিশু ও ডায়রিয়া ওয়ার্ডে সৃষ্টি হয়েছে শয্যা সংকট। অনেক রোগীকে বাধ্য হয়ে ওয়ার্ডের মেঝে ও চলাচলের পথেই চিকিৎসা নিতে দেখা গেছে। একই সঙ্গে হাসপাতালের ওষুধ সংকটের কারণে রোগীদের বাইরে থেকে অধিকাংশ ওষুধ কিনে আনতে হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, মঙ্গলবার (২ জুন) দুপুর পর্যন্ত ডায়রিয়া ও শিশু ওয়ার্ডে মোট ১৬৬ জন রোগী ভর্তি ছিলেন। এর মধ্যে অন্তত ৭০ জন ডায়রিয়ায় আক্রান্ত। প্রতিদিন নতুন করে ৪০ থেকে ৫০ জন ডায়রিয়া রোগী ভর্তি হওয়ায় পরিস্থিতি সামাল দিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে চিকিৎসক ও নার্সদের।
শুধু ভর্তি রোগীই নয়, হাসপাতালের বহির্বিভাগেও (আউটডোর) গরমজনিত নানা রোগে আক্রান্ত মানুষের দীর্ঘ সারি দেখা গেছে। গত এক সপ্তাহে ডায়রিয়া ও নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে বলে জানিয়েছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।
হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডে ভর্তি থাকা লাকী বেগম জানান, শ্বাসকষ্ট নিয়ে তার ছেলেকে ভর্তি করা হয়েছে। হাসপাতাল থেকে কিছু ওষুধ দেওয়া হলেও অধিকাংশ ওষুধ বাইরে থেকে কিনতে হয়েছে। চিকিৎসক প্রতিদিন চারবার নেবুলাইজার (গ্যাস) দিতে বলেছেন, তবে সন্তানের অবস্থার এখনো পুরোপুরি উন্নতি হয়নি।
কুড়িগ্রামপাড়া এলাকার বাসিন্দা হামিদুল ইসলাম বলেন, তীব্র গরমের কারণেই তার মেয়ের ডায়রিয়া হয়েছে বলে তিনি মনে করছেন। তিনদিন ধরে হাসপাতালে ভর্তি থাকলেও প্রয়োজনীয় ওষুধ হাসপাতাল থেকে পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে বাইরে থেকে অতিরিক্ত দামে ওষুধ কিনতে হচ্ছে।
টেংগনমারী এলাকার নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত শিশু আসিকের মা জানান, গত ১২ দিন ধরে তিনি সন্তানকে নিয়ে হাসপাতালে অবস্থান করছেন। শিশুটি ডাবল নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়েছিল। বর্তমানে কিছুটা সুস্থ হলেও চিকিৎসা ব্যয় নিয়ে দুশ্চিন্তায় রয়েছেন তিনি।
এদিকে চেংগামারী এলাকার মাকসুদা বেগম অভিযোগ করে বলেন, ডায়রিয়া ওয়ার্ডে ভর্তি রোগীদের কেবল স্যালাইন দেওয়া হচ্ছে, অধিকাংশ ওষুধই বাইরে থেকে কিনতে হচ্ছে। এছাড়া কিছু নার্সের আচরণেও অসন্তোষ প্রকাশ করেন তিনি। তার দাবি, হাসপাতালে পর্যাপ্ত ওষুধ না থাকায় সাধারণ মানুষকে চরম ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ডায়রিয়া ওয়ার্ডের সিনিয়র স্টাফ নার্স জানান, অতিরিক্ত গরমে ডায়রিয়ার প্রকোপ বৃদ্ধি পাওয়া স্বাভাবিক ঘটনা। তবে এবার রোগীর সংখ্যা তুলনামূলক বেশি। অসচেতনতা, দূষিত খাবার ও বিশুদ্ধ পানির অভাবও রোগ বৃদ্ধির অন্যতম কারণ বলে তিনি উল্লেখ করেন। রোগীর চাপ সামাল দিতে স্বাস্থ্যকর্মীদের অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে বলেও জানান তিনি।
নীলফামারী জেনারেল হাসপাতালের শিশু রোগ বিশেষজ্ঞ ডা. আব্দুল আউয়াল বলেন, বর্তমানে ভ্যাপসা গরমে শিশুদের মধ্যে ডায়রিয়া, নিউমোনিয়া, হাঁপানি, অ্যাজমা ও শ্বাসকষ্টজনিত সমস্যা বাড়ছে। শিশুদের অপ্রয়োজনে রোদে বাইরে না নেওয়া, খোলা ও বাসি খাবার পরিহার করা এবং বেশি বেশি বিশুদ্ধ পানি পান করানোর পরামর্শ দেন তিনি। পাশাপাশি কোনো ধরনের অসুস্থতা দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়ার আহ্বান জানান।
হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. মো. আব্দুল্লাহেল মাফি বলেন, তীব্র গরমের কারণে এ অঞ্চলে ডায়রিয়া ও নিউমোনিয়াসহ বিভিন্ন রোগের প্রকোপ বেড়েছে। রোগীর তুলনায় ওষুধ সরবরাহ কম থাকায় চাহিদা অনুযায়ী সব ওষুধ সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে না। তবে খুব দ্রুত নতুন ওষুধ সরবরাহ আসবে এবং পরিস্থিতির উন্নতি হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
এদিকে জেলার সচেতন মহল বলছে, চলমান তাপপ্রবাহে বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ, স্বাস্থ্যসচেতনতা বৃদ্ধি এবং হাসপাতালগুলোতে জরুরি ভিত্তিতে পর্যাপ্ত ওষুধ ও শয্যা নিশ্চিত না করা গেলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে।