মোঃ আমিরুল হক, রাজবাড়ী প্রতিনিধি:
রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ উপজেলার প্রায় সোয়া লাখ মানুষের স্বাস্থ্যসেবার একমাত্র সরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্র হলো ৫০ শয্যার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স। প্রতিদিন গড়ে চার শতাধিক রোগী চিকিৎসা নিতে আসেন, যার মধ্যে শিশু রোগীর সংখ্যা সর্বাধিক। কিন্তু বর্তমান উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তার অবহেলা ও উদাসীনতায় স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে উপজেলার প্রায় সোয়া লাখ মানুষ।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, সেদিন তিনি হাসপাতালে আসেন নাই। এর আগে সম্প্রতি গত বৃহস্পতিবার ৯ জুলাই তিনি অফিস ত্যাগ করেন। এরপর গত চারদিন কয়েকদফা খোঁজ নিয়ে জানা যায় তিনি কর্মস্থলে অনুপস্থিত। সর্বশেষ বুধবার অফিস থেকে জানায় তিনি তিনদিন ছুটিতে আছেন কিন্তু জেলা সিভিল সার্জন বলেন, তিনি একদিনের ছুটি নিয়ে ছিলেন। সাথে করে নিয়ে গেছেন সরকারি গাড়ি। যেটা তিনি নিজেই ড্রাইভ করে ব্যাক্তিগত গাড়িতে রুপান্তরিত করেছেন।
হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, গোয়ালন্দ উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মারুফ হাসান ২০২৫ সালে ১২ মে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে যোগদান করেন। এরপর বিভিন্ন অজুহাতে তিনি কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকেন। তার অনুপস্থিতি ও অবহেলার সুযোগে চিকিৎসালয়টির স্বাস্থ্যসেবা ভেঙ্গে পড়েছে। চিকিৎসাসেবা নিতে এসে ভোগান্তির শিকার হচ্ছে রোগীরা। সম্প্রতি আবাসিক মেডিকেল অফিসার ( স্বাস্থ্য কর্মকর্তা)’র বদলি হওয়ায় এই ভোগান্তি চরম আকার ধারণ করেছে।
সূত্র জানায়, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটির জনবল কাঠামো অনুযায়ী কাগজে কলমে ১৭ জন ডাক্তার রয়েছেন। হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, ডা. সাবরিনা মেহের (গাইনি) ২০২৪ সালের আগষ্ট মাসে যোগদান করেন এবং প্রথম দিকে গত বছরের মে মাস পর্যন্ত তিনি সপ্তাহে মাত্র একদিন (প্রতি বুধবার) অফিস করেছেন বলে জানা গেছে। যোগদানের পর থেকে ওই বছরের ডিসেম্বর মাস থেকে মে মাস পর্যন্ত বেশ কিছু অপারেশন করেন কিন্তু জুন থেকে অপারেশন কার্যক্রম বন্ধ রাখেন। এরপর থেকে বন্ধ রয়েছে গাইনি বিভাগ।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে শিশু বিভাগে। জুনিয়র কনসালট্যান্ট (শিশু) ডা. আলাউদ্দিন ২০১৮ সালের অক্টোবর মাসে যোগদান করে মাত্র কয়েক দিন দায়িত্ব পালনের পর থেকে দীর্ঘ চার বছর ১০ মাস অনুপস্থিত ছিলেন। সাময়িকভাবে ফিরলেও আবারও কর্মস্থল ত্যাগ করেন তিনি। অথচ কাগজে কলমে পদটি শূন্য ঘোষণা করা হয়নি, ফলে নতুন চিকিৎসক নিয়োগের সুযোগও তৈরি হয়নি। জুনিয়র কনসালটেন্ট (প্যাথলজি) ডা. নাবিলা নুজহাত দীর্ঘদিন ধরে বিনা ছুটিতে অনুপস্থিত রয়েছেন। নতুন নিয়োগ পাওয়া পাঁচ ডাক্তারের তিনজন ইতিমধ্যেই বেতন কাগজ কলমে গোয়ালন্দ হাসপাতালের হলেও পেষণে মেডিক্যাল অফিসার
ডা. শাওমিন শারমিন, ন্যাশনাল কিডনি ইন্সটিটিউট অব কিডনি ডিজেস এন্ড ইউরোলজী কাজ করছেন। মেডিক্যাল অফিসার ডা. রজত বড়ুয়া কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতাল, মেডিক্যাল অফিসার ডা. নোমানা তাজিয়া তন্নি রয়েছেন ঢাকার আরেক হাসপাতালে। গড়ে কাগজ কলমে পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা সহ ১১ জন ডাক্তার রয়েছে।
হাসপাতালে সেবা নিতে আসা উজান চর ইউনিয়নের মৃধা ডাঙা এলাকার রেহেনা খাতুন বলেন, হাসপাতালের ব্যাথার জন্য ডাক্তার দেখাতে এসেছেন। এর আগে দুদিন এসে ঘুরে গেছেন আজকে ও ডাক্তার দেখবে না। তাই তিনি পদ্মা ডায়াগনস্টিক সেন্টারে দুপুরে ফি দিয়ে তাকে দেখান। দরিদ্র মানুষের জন্য এটা মরার উপর খরার খা। জানা যায়, হাসপাতালে অর্থোপেডিক ডা. প্রহলাদ আছেন, তিনি ঢাকা থেকে সকাল ১১ টা সাড়ে এগোরাটায় আসেন তারপর উপরে রাউন্ডে যান। একটু রেস্ট দুপুর থেকে পদ্মা ডায়াগনস্টিক সেন্টারে প্রাইভেট রোগী দেখেন।
উপজেলার স্থানীয় বাসিন্দা রাফিজা খাতুন বলেন, হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসলে সামান্য কারণেই রাজবাড়ী বা ফরিদপুর পাঠিয়ে দেয়। বৃষ্টির মধ্যে সকালে আসলেও ডাক্তার অনেক পরে আসছেন।
উপজেলা হেলথ কমপ্লেক্সের সরকারি কোয়ার্টারে থাকার নিয়ম থাকলেও তিনি যোগদানের পর থেকেই মাঝে মাঝে সরকারি ডাকবাংলোয় রাত্রি যাপন করেন বলে জানা যায়। আর এভাবেই তিনি সেবা গ্রহীতাদের বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে দিনের পর দিন অনুপস্থিত থেকেই ইচ্ছেমতো চাকুরি করে চলেছেন। এসব দেখার কেউ নেই। সরকারি হাসপাতাল থাকা সত্ত্বেও স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে এলাকার মানুষ।’
এসব অভিযোগের ভিত্তিতে ডাঃ মারুফ হাসানের সাথে যোগাযোগ করার চেষ্টা করার জন্য বারবার তার ফোনে চেষ্টা করা হলেও ফোন বন্ধ পাওয়া যায়। এর আগেও বিষয়টি রাজবাড়ী জেলা সিভিল সার্জনের নজরে আনা হয়েছিল। তিনি তার ব্যাক্তিগত নাম্বার সংগ্রহের কথা বলেছিলেন। এছাড়া হাসপাতালে বায়োমেট্রিক পদ্ধতিতে হাজিরার ব্যবস্থা থাকলেও তিনি খাতায় হাজিরার ব্যবস্থা করেছেন ডাক্তারদের।
এ বিষয়ে রাজবাড়ী জেলা সিভিল সার্জন ডা. এস এম মাসুদের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ‘আমি একটা ট্রেনিংয়ে ঢাকা আসছি। তিনি সম্ভবত একদিনের ছুটি নিয়ে ছিলেন। তিনি হাসপাতালে নেই, এটা জানার পর তিনি বলেন, তার সাথে যোগাযোগ করবেন। তাছাড়া সরকারি গাড়ি ব্যবহার প্রসংগে বলেন, কোন বিশেষ ট্রেনিং বা কাজ থাকলে তিনি ঢাকা বিভাগের মধ্যে গাড়ি ব্যাবহার করতে পারেন। তিনিতো ট্রেনিংয়ে তাহলে এতোদিন ব্যাক্তিগতভাবে গাড়ি রাখার বিষয়ে তিনি বিষয়টি তদন্ত করে দেখছেন।