তিন দশকেও চালু হয়নি রাজবাড়ীর কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল: জরাজীর্ণ ভবন এখন গ্যারেজ ও মাদকসেবীদের আড্ডা, মহাসড়কে বাস দাঁড় করিয়ে যাত্রী ওঠানামায় বাড়ছে দুর্ঘটনার ঝুঁকি

মোঃ আমিরুল হক, রাজবাড়ী প্রতিনিধি:

প্রায় তিন দশক আগে যাত্রীসেবার মানোন্নয়ন ও যানজট নিরসনের লক্ষ্য নিয়ে নির্মিত রাজবাড়ীর কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনালটি আজও পূর্ণাঙ্গভাবে চালু হয়নি। দীর্ঘদিন অব্যবহৃত থাকায় কোটি টাকার এই অবকাঠামো এখন জরাজীর্ণ অবস্থায় পড়ে আছে। বাস টার্মিনালের পরিবর্তে এটি ব্যবহৃত হচ্ছে বাস মেরামতের গ্যারেজ হিসেবে। সন্ধ্যার পর সেখানে মাদকসেবীদের আড্ডা বসছে বলে অভিযোগ রয়েছে। অন্যদিকে, শহরের বিভিন্ন স্থানে মহাসড়কের ওপর বাস দাঁড় করিয়ে যাত্রী ওঠানামা করানোয় প্রতিদিনই বাড়ছে যানজট ও দুর্ঘটনার ঝুঁকি।

জানা গেছে, ১৯৯২-৯৩ অর্থবছরে রাজবাড়ী শহরের শ্রীপুর এলাকায় প্রায় ৪ একর ১৪ শতাংশ জমির ওপর এক কোটি ৭৪ লাখ টাকা ব্যয়ে কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনালটি নির্মাণ করা হয়। ১৯৯৪ সালে এর উদ্বোধন হলেও শহর থেকে তুলনামূলক দূরে অবস্থান এবং পর্যাপ্ত যাত্রী না পাওয়ার আশঙ্কায় বাসমালিকরা শুরু থেকেই টার্মিনালটি ব্যবহার করতে অনাগ্রহ প্রকাশ করেন। পরে ২০০০ সালে এটি রাজবাড়ী পৌরসভার কাছে হস্তান্তর করা হলেও কয়েক দফা চালুর উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা সফল হয়নি।

দীর্ঘদিন অব্যবহৃত থাকায় টার্মিনালের ভবনটি এখন জরাজীর্ণ। ভবনের দরজা-জানালা ভেঙে গেছে, দেয়ালের পলেস্তারা খসে পড়ছে এবং টয়লেটগুলো ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। বর্তমানে টার্মিনালের বড় একটি অংশ বাস মেরামত ও গ্যারেজ হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, সন্ধ্যার পর সেখানে মাদকসেবীদের আনাগোনা বেড়ে যায়।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, চুক্তি অনুযায়ী টার্মিনাল নির্মাণের ব্যয় জেলা পরিষদকে পরিশোধ করার কথা থাকলেও রাজবাড়ী পৌরসভা এ পর্যন্ত মাত্র ১৩ লাখ টাকা পরিশোধ করেছে। এখনও জেলা পরিষদের কাছে প্রায় ১ কোটি ৬১ লাখ টাকা বকেয়া রয়েছে। তবে পৌরসভা টার্মিনাল ইজারা এবং সংলগ্ন মার্কেট থেকে নিয়মিত রাজস্ব আদায় করে আসছে।

বর্তমানে রাজবাড়ী জেলা সড়ক পরিবহন মালিক গ্রুপ পৌরসভার কাছ থেকে ২৭ লাখ ৩৬ হাজার ২৫০ টাকায় বন্দোবস্ত নিয়ে শহরের মুরগির ফার্ম এলাকায় মহাসড়কের ওপর বাস পার্কিং পরিচালনা করছে। প্রতিটি বাস থেকে ৫০ টাকা করে ফি আদায় করা হয়। ফলে মুরগির ফার্ম, বড়পুল ও পরিবহন মালিক গ্রুপের কার্যালয়ের সামনে মহাসড়কের ওপর থেকেই যাত্রী ওঠানামা করতে হচ্ছে। এতে একদিকে যেমন তীব্র যানজট সৃষ্টি হচ্ছে, অন্যদিকে বাড়ছে দুর্ঘটনার আশঙ্কাও।

স্থানীয় বাসিন্দা, যাত্রী ও পরিবহন শ্রমিকরা দ্রুত কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনালটি সংস্কার করে চালুর দাবি জানিয়েছেন। তাদের মতে, টার্মিনালটি চালু হলে শহরের যানজট কমবে, যাত্রীসেবার মান উন্নত হবে এবং মহাসড়কে ঝুঁকিপূর্ণভাবে বাস দাঁড় করিয়ে যাত্রী ওঠানামার প্রবণতা বন্ধ হবে।

রাজবাড়ী জেলা সড়ক পরিবহন মালিক গ্রুপের নেতারা জানান, কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল চালুর বিষয়ে একাধিক বৈঠক হয়েছে। টার্মিনালটি সংস্কার করে দ্রুত চালুর বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনা চলছে।

এ বিষয়ে রাজবাড়ী পৌরসভার বর্তমান প্রশাসক ও স্থানীয় সরকার বিভাগের উপপরিচালক কল্যাণ চৌধুরী বলেন, জেলা পরিষদের বকেয়া অর্থ ধাপে ধাপে পরিশোধ করা হচ্ছে। টার্মিনালটি পুনরায় চালুর বিষয়ে জেলা প্রশাসন, জেলা পরিষদ ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনা করে যৌথ সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

রাজবাড়ী জেলা পরিষদের প্রশাসক আব্দুস সালাম মিয়া বলেন, কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনালের বিশাল জায়গার সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করতে পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। টার্মিনালের একাংশ সচল রেখে অন্য অংশে এক হাজার আসনবিশিষ্ট জেলা পরিষদ অডিটোরিয়াম নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যার জন্য ইতোমধ্যে এক কোটি টাকা বরাদ্দ পাওয়া গেছে। পাশাপাশি সেখানে জেলা কালেক্টরেট স্কুল নির্মাণের পরিকল্পনাও রয়েছে।

ফেসবুকে আমরা

মন্তব্য করুন

guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted

সর্বাাধিক পঠিত নিউজ

Scroll to Top