মো. সাইফুল ইসলাম, নীলফামারী প্রতিনিধি:
উত্তরাঞ্চলের মানুষের দীর্ঘদিনের স্বপ্ন ও প্রত্যাশার প্রকল্প তিস্তা মহাপরিকল্পনা দ্রুত বাস্তবায়নের আশ্বাস দিয়েছেন পানিসম্পদ মন্ত্রী শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানি। তিনি বলেছেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে সরকার তিস্তা অববাহিকার মানুষের দুর্ভোগ লাঘব, কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি, নদীভাঙন নিয়ন্ত্রণ এবং টেকসই পানি ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে কাজ করছে। পদ্মা সেতুর মতোই তিস্তা মহাপরিকল্পনাও পরিকল্পনা থেকে বাস্তবে রূপ নিতে যাচ্ছে।
শুক্রবার (১৯ জুন) নীলফামারীর ডিমলা উপজেলার তিস্তা ব্যারাজ, প্রধান সেচ ক্যানেল, চারালকাটা নদী এবং তিস্তা অববাহিকার বিভিন্ন এলাকা পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে তিনি এসব কথা বলেন।
মন্ত্রী বলেন, “তিস্তা শুধু একটি নদী নয়, এটি উত্তরাঞ্চলের কোটি মানুষের জীবন-জীবিকার সঙ্গে জড়িত। দীর্ঘদিন ধরে এ অঞ্চলের মানুষ পানির অভাব, নদীভাঙন, বন্যা ও খরার মতো বহুমাত্রিক সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছে। সরকার এসব সমস্যার স্থায়ী সমাধানে তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিয়েছে। প্রয়োজনীয় কারিগরি ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে দ্রুত প্রকল্পটি জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) অনুমোদনের জন্য উপস্থাপন করা হবে।”
পানিসম্পদ মন্ত্রী বলেন, শুষ্ক মৌসুমে উজান থেকে পর্যাপ্ত পানি না পাওয়ায় তিস্তা নদীতে পানির প্রবাহ আশঙ্কাজনকভাবে কমে যায়। এতে কৃষি উৎপাদন ব্যাহত হয়, সেচ সংকট দেখা দেয় এবং মৎস্যসম্পদ হুমকির মুখে পড়ে। অন্যদিকে বর্ষা মৌসুমে ভারতের গজলডোবা ব্যারাজের গেট খুলে দিলে হঠাৎ নেমে আসা ঢলে তিস্তা তীরবর্তী এলাকায় ভয়াবহ বন্যা ও নদীভাঙনের সৃষ্টি হয়।
তিনি বলেন, “প্রতিবছর হাজার হাজার পরিবার নদীভাঙনের শিকার হয়ে বসতভিটা হারাচ্ছে। অনেক কৃষক তাদের আবাদি জমি হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়ছেন। মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে আধুনিক নদীশাসন, স্থায়ী বাঁধ নির্মাণ, ড্রেজিং, পানি সংরক্ষণ এবং সেচ ব্যবস্থার উন্নয়নের মাধ্যমে এ সমস্যাগুলোর দীর্ঘমেয়াদি সমাধান সম্ভব হবে।”
মন্ত্রী জানান, তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে উত্তরাঞ্চলের কৃষি উৎপাদনে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসবে। সেচ সুবিধা বৃদ্ধি পাওয়ায় ফসলের উৎপাদন বাড়বে, কৃষকের আয় বৃদ্ধি পাবে এবং নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে। একই সঙ্গে নদীভাঙন রোধ ও পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষার মাধ্যমে তিস্তা অববাহিকার মানুষের জীবনমান উন্নত হবে।
তিনি বলেন, “এ প্রকল্প শুধু একটি নদী ব্যবস্থাপনা প্রকল্প নয়, এটি উত্তরাঞ্চলের অর্থনৈতিক মুক্তির একটি রূপকল্প। এর মাধ্যমে কৃষি, মৎস্য, যোগাযোগ, পরিবেশ ও আঞ্চলিক অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।”
পরিদর্শনকালে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু বলেন, তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নে বিদেশি অর্থায়নের জন্য অপেক্ষা করার প্রয়োজন নেই। সরকারের নিজস্ব অর্থায়নেই ধাপে ধাপে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা সম্ভব।
তিনি বলেন, “প্রায় ১২ থেকে ১৩ হাজার কোটি টাকার এই প্রকল্প ১০ বছর মেয়াদে বাস্তবায়ন করা যেতে পারে। প্রতিবছর দুই থেকে তিন হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হলে প্রকল্পটি সফলভাবে এগিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে। প্রয়োজনে আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞদের কারিগরি সহায়তা নেওয়া হবে, তবে অর্থায়নের জন্য বিদেশি ঋণের ওপর নির্ভরশীল হওয়ার প্রয়োজন নেই।”
উত্তরাঞ্চলের মানুষের দীর্ঘদিনের দাবি
তিস্তা নদীকে কেন্দ্র করে নীলফামারী, লালমনিরহাট, রংপুর, কুড়িগ্রাম ও গাইবান্ধা জেলার লাখো মানুষ বছরের পর বছর খরা, বন্যা ও নদীভাঙনের শিকার হয়ে আসছেন। বিভিন্ন সময়ে তিস্তা মহাপরিকল্পনার দাবি জোরালো হলেও তা বাস্তবায়নের উদ্যোগ দীর্ঘদিন ধরে অনিশ্চয়তায় ছিল। বর্তমান সরকারের সক্রিয় উদ্যোগে প্রকল্পটি আবারও বাস্তবায়নের পথে এগিয়ে যাওয়ায় তিস্তা পাড়ের মানুষের মধ্যে নতুন আশার সঞ্চার হয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা মনে করছেন, পরিকল্পনাটি বাস্তবায়িত হলে কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি, নদীভাঙন নিয়ন্ত্রণ, পানিসম্পদের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা এবং পরিবেশ সংরক্ষণের মাধ্যমে উত্তরাঞ্চলে টেকসই উন্নয়নের নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে।
পরিদর্শনকালে পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন আজাদ, নীলফামারীর জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ নায়িরুজ্জামান, বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের রংপুর অঞ্চলের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী ড. মো. সরফরাজ বান্দাসহ সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।