মোঃ আমিরুল হক, রাজবাড়ী প্রতিনিধি:
কোনবা পথে নিতাইগঞ্জে যাই, পরাণের বান্ধব রে, বুড়ি হইলাম তোর কারণে, নারীর কাছে কেউ যায় না, আমার ভাঁটি গাঙের নাইয়া প্রভৃতি গানের জন্য বিখ্যাত কাঙ্গালিনী সুফিয়া। খ্যাতি ও যশ থাকলেও নেই অর্থ। বাথরুমে পড়ে গিয়ে হাত ভেঙ্গে বিনা চিকিৎসায় ধুকছেন কাঙ্গালিনী সুফিয়া। তিনি রাজবাড়ী সদর উপজেলার আলীপুর ইউনিয়নের কল্যাণপুরে সরকারী ভাবে বাড়ীতেই শয্যাশায়ী। অর্থের অভাবে স্থানীয় কবিরাজ দিয়ে হাতের চিকিৎসা করছেন। বয়সের ভারে ন্যুজ হয়ে পড়েছেন। ফলে গান গাইতে পারছেন না। এতে তার আয়ের পথ বন্ধ হয়ে পড়েছে।
অসুস্থ কাঙ্গালিনী সুফিয়া বলেন, মেয়ে পুষ্প বাড়ীতে ছিল না। সে ঢাকায় থাকায় আমি রাতে বাথরুমে গিয়ে পড়ে যাই। এতে আমার হাত ভেঙ্গে যায়। টাকা না থাকায় প্রতিবেশীরা কবিরাজ দিয়ে হাতে জাব দিয়েছে। টাকার অভাবে ডাক্তার দেখাতে পারছি না।
তিনি আরও বলেন, আগে বিভিন্ন প্রগ্রাম করতাম। এখন বয়সের ভারে ও শারিরীক ভাবে অসুস্থ থাকায় তা করতে পারি না। রাজবাড়ী সদর উপজেলার আলীপুর ইউনিয়নের কল্যাণপুরে দু’বেলা খেয়ে না খেয়ে বসবাস করছি।
প্রতিবেশীরা খোঁজখবর রাখায় কোন মতো চলছি। কাঙ্গালিনী সুফিয়ার দেখাশোনার দায়িত্বে থাকা মেয়ে পুষ্প বলেন, আমি কাজে ঢাকায় যাওয়ায় মা বাথরুমে পড়ে হাত ভেঙ্গে যায়। কোন ডাক্তার দেখাতে পারি নাই। স্থানীয় কবিরাজ দিয়ে চিকিৎসা করাচ্ছি। অর্থাভাবে চিকিৎসা টাও করাতে পারছি।
জানা গেছে, কাঙ্গালিনী সুফিয়ার প্রকৃত নাম টুনি হালদার। তিনি ১৯৬১ সালে রাজবাড়ী জেলার বালিয়াকান্দি উপজেলার ইসলামপুর ইউনিয়নের রামদিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। বাবার নাম খোকন হালদার ও মা টুলু হালদার। গ্রাম্য একটি গানের অনুষ্ঠানে ১৪ বছর বয়সে তিনি তার সঙ্গীত জীবন শুরু করেন। মাত্র ১৫ বছর বয়সে সুধির হালদার নামের একজন বাউলের সঙ্গে তার বিয়ে হয়। যদিও সে বিয়ে বেশিদিন টেকেনি। ওস্তাদ হালিম বয়াতির শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন ১৯৭৮ সালে। সে সময় তিনি ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে সুফিয়া খাতুন নাম ধারণ করেন। তার গুরু দেবেন থাপা, গৌর মোহস্ত। তার প্রিয় শিল্পী লালন ফকির, আব্দুল আলীম। সুফিয়ার – মোট রচিত গানের সংখ্যা প্রায় ৫০০টি। তিনি রাজ সিংহাসন চলচ্চিত্রে – প্রথম কণ্ঠ দেন। তিনি যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, দক্ষিণ কোরিয়া, থাইল্যান্ড, চীন, ভারতের বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করেন।
বাংলাদেশ বেতারের সাবেক পরিচালক ফজল-এ-খোদা একদিন হাইকোর্টের মাজারে কাঙালিনী সুফিয়াকে গাইতে দেখেন। তিনি কাঙালিনী – সুফিয়াকে বেতারে আসার আমন্ত্রণ জানান। তিনি ছিলেন সে সময় পথগায়ক। কাঙালিনী সুফিয়া নিজে বলেছেন যে, প্রথম সুধী সমাজে তাঁকে – পরিচিত করান কবি ফজল-এ-খোদা। বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির সাবেক ডিজি মুস্তাফা মনোয়ার তাকে কাঙ্গালিনী উপাধি প্রদান করেন।
-তারপর থেকে তিনি সুফিয়া খাতুন থেকে দেশব্যাপী কাঙ্গালিনী সুফিয়া নামে পরিচিত হন।
কাঙ্গালিনী সুফিয়া দেয়াল, নোনাজলের গল্প প্রভৃতি নাটকে অভিনয় করেন। নোনাজলের গল্প বুড়ি হইলাম তোর কারণে গানটি অবলম্বনে নির্মিত হয়। যেখানে সুফিয়া প্রধান চরিত্রে একজন বাউলের ভূমিকায় অভিনয় করেন। – এছাড়াও তিনি ১৯৯৭ সালে বুকের ভেতর আগুন নামে একটি চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন। সংগীতে তিনি প্রায় ৩০টি জাতীয় ও ১০টি আন্তর্জাতিক পুরস্কার লাভ করেন।
রাজবাড়ী জেলা প্রশাসক আফরোজা পারভীন বলেন, কাঙ্গালিনী সুফিয়ার অসুস্থ্য হওয়ার বিষয়টি আমার জানা ছিল না। জানতে পেরে তাকে আর্থিক সহায়তা প্রদান করা হয়েছে।