নিজস্ব প্রতিনিধি:
মুন্সীগঞ্জের গজারিয়া উপজেলার নদীবেষ্টিত গুয়াগাছিয়া এলাকায় নৌ-ডাকাত ও সন্ত্রাসী বাহিনীর দৌরাত্ম্যে আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন কয়েক হাজার বাসিন্দা। স্থানীয়দের অভিযোগ, অস্ত্রের মহড়া, নৌযানে ডাকাতি, চাঁদাবাজি, অবৈধ বালু উত্তোলন এবং মাদক ব্যবসা নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয় রয়েছে একাধিক অপরাধী চক্র।
ভুক্তভোগীদের দাবি, ডাকাত দলের সদস্যরা প্রকাশ্যে অস্ত্র নিয়ে মহড়া দেয় এবং এসব কর্মকাণ্ড সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লাইভ প্রচার করে। কোনো ব্যক্তিকে ধরে নিয়ে নির্যাতনের অভিযোগ উঠলে তার ভিডিওও ফেসবুক ও ইউটিউবে ছড়িয়ে দেওয়া হয় বলে জানান স্থানীয়রা।
এলাকাবাসীর ভাষ্য, চিহ্নিত অপরাধীদের কেউ কেউ গ্রেপ্তার হলেও অল্প সময়ের মধ্যেই জামিনে মুক্ত হয়ে এলাকায় ফিরে আসে। তাদের মুক্তির পর প্রকাশ্যে সংবর্ধনা দেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, এসব ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কিছু সদস্যের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।
গুয়াগাছিয়াকে ঘিরে বর্তমানে দুটি বড় ডাকাত দল সক্রিয় রয়েছে বলে পুলিশের তথ্য। একটির নেতৃত্বে রয়েছে নয়ন, পিয়াস ও রিপন; অন্যটির নেতৃত্বে লালু, সৈকত ও জয়। দুই দলের সদস্যসংখ্যা শতাধিক বলে জানা গেছে। বাহিনীপ্রধান ও তাদের সহযোগীদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন থানায় একাধিক মামলা রয়েছে।
পুলিশের তালিকা অনুযায়ী, নয়নের বিরুদ্ধে চাঁদপুর, কুমিল্লা, শরীয়তপুর ও মুন্সীগঞ্জে প্রায় ৩৮টি মামলা রয়েছে। পিয়াসের বিরুদ্ধে ৩৪টি এবং রিপনের বিরুদ্ধে ২৬টি মামলা রয়েছে বলে স্থানীয় সূত্র ও পুলিশ রেকর্ডে উল্লেখ করা হয়েছে।
গত দেড় বছরে গুয়াগাছিয়ায় একাধিক হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে রহমান দেওয়ান, রাজনৈতিক কর্মী বাবলা, মান্নান, প্রবাসী শ্রমিক হৃদয় ও জয় হত্যার ঘটনা আলোচিত। সর্বশেষ গত ১৯ এপ্রিল রাকিব নামে এক যুবককে বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে নির্যাতনের পর হত্যা করা হয় বলে অভিযোগ ওঠে।
নিহত রাকিবের বোন আঁখি আক্তার অভিযোগ করেন, পিয়াস বাহিনীর সদস্যরা রাকিবকে বাড়ি থেকে ডেকে নিয়ে যায়। পরে গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে উদ্ধার করা হলেও হাসপাতালে নেওয়ার পথে তার মৃত্যু হয়। তিনি দাবি করেন, আহত রাকিবকে হাসপাতালে নেওয়ার সময় হামলাকারীরা ট্রলার আটকে দেয় এবং এতে চিকিৎসা পেতে দেরি হয়।
স্থানীয়দের অভিযোগ, মেঘনার বিভিন্ন শাখা নদীতে চলাচলকারী নৌযানে ডাকাতি নিয়মিত ঘটনায় পরিণত হয়েছে। পাশাপাশি অবৈধ ড্রেজিং, বালু ব্যবসা ও মাদক কারবার নিয়ন্ত্রণ নিয়েও অপরাধী চক্রগুলোর মধ্যে প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতা রয়েছে।
এলাকাবাসী আরও জানান, ইঞ্জিনচালিত ট্রলার ও স্পিডবোটে অস্ত্র নিয়ে চলাচল এবং মহড়ার ভিডিও বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া হয়। এসব ভিডিওতে দেশীয় অস্ত্রের পাশাপাশি আগ্নেয়াস্ত্রও দেখা যায় বলে অভিযোগ রয়েছে।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে গুয়াগাছিয়ায় একটি স্থায়ী পুলিশ ক্যাম্প স্থাপন করা হয়েছিল। ক্যাম্প চালুর পর কয়েকজন তালিকাভুক্ত অপরাধীকে গ্রেপ্তার করা হলেও তারা পরে জামিনে মুক্তি পায় বলে জানা গেছে।
পুলিশ ক্যাম্পের জন্য বাড়ি ভাড়া দেওয়াকে কেন্দ্র করে স্থানীয় ব্যবসায়ী হাজি আব্দুল কাইয়ুম দেওয়ানের ওপর হামলার অভিযোগও উঠেছে। তিনি জানান, পুলিশ ক্যাম্প স্থাপনে সহযোগিতা করায় সন্ত্রাসীরা তার ওপর হামলা চালায়। এ ঘটনায় মামলা হলেও অভিযুক্তদের সবাইকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়নি বলে তার অভিযোগ।
স্থানীয়দের দাবি, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের আগে এলাকার অনেক অপরাধী নিজেদের আওয়ামী লীগের কর্মী বা নেতা হিসেবে পরিচয় দিতেন। পরে তারা পরিচয় বদলে অন্য রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার চেষ্টা করছেন বলেও অভিযোগ করেন তারা।
মুন্সীগঞ্জের পুলিশ সুপার মেনহাজুল আলম জানিয়েছেন, রাকিব হত্যা মামলায় একজন আসামিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং অন্যদের ধরতে অভিযান চলছে। তিনি বলেন, নদীবেষ্টিত এলাকা হওয়ায় থানা পুলিশ, নৌ-পুলিশ ও কোস্ট গার্ডের সমন্বয়ে অভিযান পরিচালনা করতে হয়।
পুলিশ সুপার দাবি করেন, এলাকায় বর্তমানে নিয়মিত টহল জোরদার করা হয়েছে এবং পরিস্থিতি আগের তুলনায় অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।