নিজস্ব প্রতিনিধি:
বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের পানিসংকট দূর করতে পদ্মা নদীর ওপর প্রায় ৩৫ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে নতুন একটি ব্যারাজ নির্মাণের অনুমোদন দিয়েছে সরকার। ‘পদ্মা ব্যারাজ’ নামের এই মেগা প্রকল্প আগামী সাত বছরে বাস্তবায়ন করা হবে সম্পূর্ণ নিজস্ব অর্থায়নে।
বুধবার (১৩ মে) সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান-এর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় প্রকল্পটির অনুমোদন দেওয়া হয়।
সরকারের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রকল্পটির মূল উদ্দেশ্য হলো দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মৃতপ্রায় পাঁচটি নদী পুনরুজ্জীবিত করা এবং ওই অঞ্চলের দীর্ঘদিনের পানিসংকট নিরসন করা। পানিসম্পদমন্ত্রী শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানি জানিয়েছেন, প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে দেশের ২৪টি জেলার প্রায় সাত কোটি মানুষ উপকৃত হবে।
মন্ত্রী বলেন, ফারাক্কা বাঁধের কারণে শুষ্ক মৌসুমে ওই অঞ্চলে তীব্র খরা পরিস্থিতি সৃষ্টি হয় এবং পদ্মার সঙ্গে সংযুক্ত নদীগুলো শুকিয়ে যায়। ফলে লবণাক্ততা বৃদ্ধি, কৃষি ক্ষতি এবং জীববৈচিত্র্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। আবার বর্ষাকালে কোথাও কোথাও জলাবদ্ধতাও তৈরি হয়।
একনেক সভা শেষে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, নির্বাচনের আগে দেওয়া প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের অংশ হিসেবেই এই প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। আগামী অর্থবছর থেকেই প্রকল্পের প্রথম ধাপের কাজ শুরু হবে।
ব্যারাজ কী এবং কেন গুরুত্বপূর্ণ?
ব্যারাজ হলো নদীর পানিপ্রবাহ নিয়ন্ত্রণের জন্য নির্মিত বিশেষ অবকাঠামো। এটি বাঁধের মতো পুরো পানি আটকে দেয় না; বরং একাধিক গেট বা দরজার মাধ্যমে পানির প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করে। সাধারণত কৃষি সেচ, নদীর প্রবাহ পুনরুদ্ধার এবং পানি সংরক্ষণের জন্য ব্যারাজ নির্মাণ করা হয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, যথাযথ পরিকল্পনা ও ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে ব্যারাজ নির্মাণ করা গেলে কৃষি, মৎস্য, নৌপথ এবং পরিবেশে ইতিবাচক পরিবর্তন আনা সম্ভব। তবে ভুল পরিকল্পনা হলে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকিও রয়েছে।
কোথায় নির্মাণ হবে পদ্মা ব্যারাজ?
প্রকল্পের আওতায় রাজবাড়ীর পাংশা উপজেলায় প্রায় ২ দশমিক ১ কিলোমিটার দীর্ঘ ব্যারাজ নির্মাণ করা হবে। এতে থাকবে ৭৮টি স্পিলওয়ে, ১৮টি আন্ডার স্লুইস এবং দুটি ফিশ পাস।
সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, ব্যারাজের মাধ্যমে প্রায় ২৯০ কোটি ঘনমিটার পানি সংরক্ষণ করা হবে। পরে সেই পানি বিভিন্ন নদীতে সরবরাহ করে গড়াই-মধুমতী, হিসনা-মাথাভাঙ্গা, চন্দনা-বারাশিয়া, বড়াল ও ইছামতী নদীর প্রবাহ পুনরুদ্ধার করা হবে।
প্রথম ধাপে গড়াই-মধুমতী নদীতে ১৩৫ কিলোমিটারের বেশি এবং হিসনা নদীতে প্রায় ২৪৬ কিলোমিটার পুনঃখনন ও ড্রেজিং করা হবে। দ্বিতীয় ধাপে অন্যান্য নদী পুনরুদ্ধারের কাজ হবে।
কৃষি, বিদ্যুৎ ও অর্থনীতিতে বড় প্রভাব
প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে প্রায় ২৯ লাখ হেক্টর কৃষিজমিতে সেচ সুবিধা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে বলে দাবি করছে সরকার। এতে বছরে প্রায় ২৪ লাখ টন অতিরিক্ত ধান এবং প্রায় সোয়া দুই লাখ টন মাছ উৎপাদন বাড়তে পারে।
এছাড়া লবণাক্ততা কমানো, সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য রক্ষা, নদীপথ সচল রাখা এবং বিভিন্ন সেচ প্রকল্পে পানি সরবরাহ নিশ্চিত করতেও এই ব্যারাজ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সরকার জানিয়েছে, ২০৩৩ সালের পর দ্বিতীয় ধাপে ব্যারাজ ঘিরে তিনটি পানি বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং সাতটি স্যাটেলাইট শহর নির্মাণের পরিকল্পনাও রয়েছে।
কর্মকর্তাদের হিসাব অনুযায়ী, পুরো প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে বছরে প্রায় আট হাজার কোটি টাকার আর্থ-সামাজিক সুবিধা পাওয়া যেতে পারে।