নিজস্ব প্রতিনিধি:
উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের নামে আওয়ামী লীগ সরকারের সাড়ে ১৫ বছরের শাসনামলে বাংলাদেশ নতুন করে প্রায় ৮ হাজার ৬২ কোটি ডলার বৈদেশিক ঋণ নিয়েছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, এসব ঋণের বড় অংশই ছিল উচ্চ সুদ ও কঠিন শর্তনির্ভর, যার চাপ এখন দেশের অর্থনীতি ও সাধারণ মানুষের ওপর পড়ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, স্বাধীনতার পর থেকে দেশের মোট বৈদেশিক ঋণের প্রায় ৭৮ শতাংশই নেওয়া হয়েছে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে। বাকি ২২ শতাংশ এসেছে অন্যান্য সরকারের সময়ে।
প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২০০৯ সালের শুরুতে দেশের মোট বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ ছিল ২ হাজার ২৭৯ কোটি ডলার। ২০২৪ সালের জুনে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১০ হাজার ৩৪১ কোটি ডলারে। অর্থাৎ আওয়ামী লীগ সরকারের সময়েই ঋণ বেড়েছে ৮ হাজার কোটি ডলারের বেশি।
একই সময়ে ডলারের দামও ব্যাপক বেড়েছে। ২০০৯ সালে প্রতি ডলারের মূল্য ছিল ৬৯ টাকা, যা ২০২৪ সালের আগস্টে ১২০ টাকায় পৌঁছায়। এমনকি কিছু ব্যাংকে ডলার বিক্রি হয়েছে ১৩২ টাকা পর্যন্ত। ফলে ঋণ পরিশোধে সরকারের ব্যয়ও কয়েকগুণ বেড়ে গেছে।
শুধু ডলারের দাম নয়, বেড়েছে সুদের হারও। ২০০৯ সালে বৈদেশিক ঋণের সুদ ছিল ৪ থেকে ৫ শতাংশের মধ্যে। বর্তমানে তা বেড়ে ৭ থেকে ৯ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। বৈশ্বিক মন্দার সময় এই হার আরও বেড়েছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, অধিকাংশ ঋণ স্থানীয় মুদ্রাভিত্তিক প্রকল্পে ব্যয় হওয়ায় সেগুলো থেকে বৈদেশিক মুদ্রা আয় হয়নি। ফলে ঋণ পরিশোধে বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে। একইসঙ্গে ঋণের অর্থের একটি অংশ বিদেশে পাচার হওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
চলতি অর্থবছরের মার্চ পর্যন্ত সরকার ইতোমধ্যে প্রায় ৪০০ কোটি ডলার বৈদেশিক ঋণ পরিশোধ করেছে। আগামী অর্থবছরে সবচেয়ে বেশি ঋণ পরিশোধ করতে হবে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট সূত্র। গত অর্থবছরে প্রায় ৪৫০ কোটি ডলার পরিশোধ করা হলেও চলতি অর্থবছরে তা ৫০০ কোটি ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, বর্তমানে বৈদেশিক ঋণের বিপরীতে দেশের রিজার্ভের অনুপাত নেমে এসেছে ২৩ শতাংশে, যেখানে ২০২০ সালে এটি ছিল ৬০ শতাংশ। ফলে রিজার্ভের ওপর চাপ ক্রমেই বাড়ছে।
অন্যদিকে মাথাপিছু বৈদেশিক ঋণও বেড়েছে উল্লেখযোগ্য হারে। ২০০৯ সালে যেখানে মাথাপিছু বিদেশি ঋণ ছিল ১৬৯ ডলার, ২০২৪ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৬০৭ ডলারে। ২০২৫ সালের ডিসেম্বর নাগাদ এই পরিমাণ ৬৫৭ ডলারে পৌঁছেছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, উন্নয়ন প্রকল্পের নামে নেওয়া এসব ঋণের যথাযথ ব্যবহার না হওয়ায় দেশের অর্থনীতি এখন দীর্ঘমেয়াদি চাপে পড়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধের কারণে আমদানি ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, বৈদেশিক ঋণ এমন খাতে ব্যয় করা উচিত ছিল যেখান থেকে বৈদেশিক মুদ্রা আয় সম্ভব। কিন্তু বাস্তবে অধিকাংশ ঋণ স্থানীয় প্রকল্পে ব্যয় হওয়ায় এখন ঋণের বোঝা টানতে গিয়ে রিজার্ভ ও সামগ্রিক অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।