অসমাপ্ত দায়িত্ব রেখে বিদায় ডিসি সারওয়ারের

আখলাক হুসাইন, সিলেট প্রতিনিধিঃ
সিলেটের জেলা প্রশাসক (ডিসি) মো. সারওয়ার আলম এক কঠিন ও চাপে ভরা সময় পার করছিলেন। বিশেষ করে মাজারের আয়-ব্যয়ের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে গিয়ে তিনি কঠোর অবস্থানে ছিলেন, যা তাকে নানামুখী চাপের মুখে ফেলে। হঠাৎ করে প্রত্যাহারের আদেশ আসার পর তিনি দায়িত্ব হস্তান্তরের জন্য কিছুটা ‘যৌক্তিক’ সময় চেয়েছিলেন। তবে সেই সুযোগ তাকে দেওয়া হয়নি।

রোববার দুপুরে প্রত্যাহারের চিঠি সিলেটে পৌঁছায়, যখন তিনি অফিসে কর্মরত ছিলেন। বিকেলের মধ্যেই খবরটি ছড়িয়ে পড়ে। জেলা প্রশাসনের একাধিক কর্মকর্তা জানান, এমন সিদ্ধান্তের জন্য প্রস্তুত ছিলেন না সারওয়ার আলম। আকস্মিক এ ঘটনায় তিনি মানসিকভাবে ব্যথিত হয়ে পড়েন।

সন্ধ্যায় সহকর্মীদের সঙ্গে এক অনানুষ্ঠানিক বৈঠকে তিনি আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। এদিকে, তার পক্ষে যেমন সমর্থন ছিল, তেমনি তার প্রত্যাহারের দাবিতেও বিক্ষোভ চলছিল। পরিস্থিতি ছিল উত্তেজনাপূর্ণ ও সংবেদনশীল।

সিলেটের একটি অংশের মানুষ তাকে দায়িত্বে রাখতে চাইলেও ঊর্ধ্বতন প্রশাসনের নির্দেশ ছিল দ্রুত দায়িত্ব হস্তান্তরের। আশঙ্কা করা হচ্ছিল, মাজার-সংক্রান্ত বিষয় নিয়ে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে। ফলে সোমবার দুপুরের মধ্যেই তাকে দায়িত্ব ছাড়ার জন্য চাপ বাড়তে থাকে।

সোমবার দুপুরে তিনি অফিস ত্যাগ করে মাজারে যান এবং দানবাক্স খোলার কার্যক্রম শুরু করেন। এ ঘটনা দ্রুত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে এবং সারা দেশের নজর পড়ে মাজারের হিসাবের দিকে। তবে এই গণনার কাজ শেষ করার আগেই ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে তাকে সার্কিট হাউজে ডেকে নেওয়া হয়।

সেখানে আগে থেকেই দায়িত্ব হস্তান্তরের সব প্রস্তুতি সম্পন্ন ছিল। তিনি নিজ পছন্দের একজন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসকের কাছে দায়িত্ব দিতে চাইলেও তা সম্ভব হয়নি। নির্দেশনা অনুযায়ী অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট পিংকি সাহার কাছে দায়িত্ব হস্তান্তর করা হয়। পুরো প্রক্রিয়া শেষ হতে রাত ১০টা বেজে যায়।

দায়িত্ব হস্তান্তরের পর তার নিরাপত্তা প্রত্যাহার করা হয়। যদিও সেদিন রাতেই সিলেট ছাড়ার কথা বলা হয়েছিল, তিনি পরদিন মঙ্গলবার দুপুরে বিমানযোগে সিলেট ত্যাগ করেন। যাওয়ার আগে নিজের ফেসবুক আইডিতে সংক্ষিপ্ত বিদায় বার্তায় তিনি লেখেন— “বিদায় সিলেট। ভালো থাকুন সিলেটবাসী। আপনাদের ভালোবাসায় আমি ধন্য।”

এর আগে সোমবার সকালে তিনি সার্কিট হাউজে কর্মকর্তাদের সঙ্গে আরেকটি অনানুষ্ঠানিক বৈঠক করেন এবং কিছু দিকনির্দেশনাও দেন।

এদিকে, তার উদ্যোগে শাহজালাল (র.) মাজারের দানবাক্স খুলে আয়-ব্যয়ের একটি স্বচ্ছ চিত্র উঠে আসে। গত বৃহস্পতিবার সিলগালা করা দানবাক্স সোমবার খোলা হলে মাত্র তিন দিনে সংগৃহীত হয় ১৭ লাখ ৬৫ হাজার টাকা। এই অর্থ জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে এনে সোনালী ব্যাংকের একটি নতুন অ্যাকাউন্টে জমা রাখা হয়।

জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তারা জানান, সংগৃহীত অর্থের সঙ্গে ডিসি তার ব্যক্তিগত তহবিল থেকে আরও ৫ লাখ টাকা অনুদান দেন। ফলে মোট জমা হয় ২২ লাখ ৬৫ হাজার টাকা। এছাড়া দানবাক্সে পাওয়া গেছে ডলার, পাউন্ড, রিয়াল এবং স্বর্ণালংকারও।

সব মিলিয়ে, দায়িত্ব পালনকালে স্বচ্ছতা প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিয়ে আলোচনায় থাকা সারওয়ার আলম শেষ পর্যন্ত সময় না পেয়েই বিদায় নিতে বাধ্য হন—যা প্রশাসনিক অঙ্গনে এক আলোচিত অধ্যায়ে পরিণত হয়েছে।

ফেসবুকে আমরা

মন্তব্য করুন

guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted

সর্বাাধিক পঠিত নিউজ

Scroll to Top