সাতবারের চেষ্টায় স্বপ্নপূরণ, ৪৭তম বিসিএসে পুলিশ ক্যাডারে রাজবাড়ীর শিহাব: ফল প্রকাশের ১৯ দিন আগেই না ফেরার দেশে বাবা, সাফল্যের আনন্দেও বেদনাভার

মো. আমিরুল হক, রাজবাড়ী প্রতিনিধি:

সাতবারের নিরলস প্রচেষ্টা, একের পর এক ব্যর্থতা আর বাবার অটুট বিশ্বাস সবকিছুর সমন্বয়ে অবশেষে স্বপ্নের ঠিকানায় পৌঁছেছেন রাজবাড়ীর পাংশা উপজেলার যশাই ইউনিয়নের চরলক্ষীপুর (হরিরামপুর) গ্রামের কৃতি সন্তান শিহাব খান। ৪৭তম বিসিএস পরীক্ষায় তিনি পুলিশ ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছেন।

গত ২৮ জুন প্রকাশিত ফলাফলে মেধাক্রমে ১৩১তম স্থান অর্জন করেন তিনি। তবে এই অর্জনের সবচেয়ে বড় সাক্ষী হওয়ার কথা ছিল যিনি, সেই বাবা আব্দুস শুকুর প্রামানিক ফল প্রকাশের মাত্র ১৯ দিন আগে মৃত্যুবরণ করেন।

শিহাব খান উদয়পুর উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ২০১১ সালে এসএসসি, পাংশা সরকারি কলেজ থেকে ২০১৩ সালে এইচএসসি এবং ২০১৪-১৫ শিক্ষাবর্ষে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগে ভর্তি হন। সেখান থেকেই স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন।

বিসিএসে তাঁর পথচলা ছিল দীর্ঘ ও সংগ্রামময়। ৪১তম বিসিএসে নন-ক্যাডার (৯ম গ্রেড) হিসেবে প্রকৌশল কলেজে রসায়নের প্রভাষক পদে সুপারিশপ্রাপ্ত হন। ৪৩তম ও ৪৫তম বিসিএসে ভাইভা দিয়েও ক্যাডার পাননি। পরে ৪৪তম বিসিএসে কারিগরি শিক্ষা ক্যাডার (রসায়ন), ৪৯তম বিশেষ বিসিএস এবং ৪৬তম বিসিএসে সাধারণ শিক্ষা ক্যাডার (রসায়ন) অর্জন করেন। অবশেষে সপ্তম প্রচেষ্টায় ৪৭তম বিসিএসে পুলিশ ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়ে দীর্ঘদিনের স্বপ্ন পূরণ করেন।

বাবাকে স্মরণ করে আবেগঘন কণ্ঠে শিহাব বলেন, “আমি তো এমন কোনো সফলতা চাইনি, হে খোদা, যে অর্জনের দিকে তাকিয়ে আমার আব্বার চোখ দুটো আর কখনো হাসবে না।” তিনি বলেন, সংসারে অভাব-অনটন থাকলেও বাবা কখনো তাঁর স্বপ্নে ভাটা পড়তে দেননি। প্রতিটি বিসিএসের পর বাবা বলতেন, “আরেকবার চেষ্টা কর, তুমি পারবে।” সেই কথাই তাঁকে বারবার নতুন করে লড়াই করার শক্তি জুগিয়েছে।

ফল প্রকাশের অনুভূতি জানিয়ে শিহাব বলেন, “সপ্তমবার বিসিএস ভাইভা দেওয়ার পর কাঙ্ক্ষিত রেজিস্ট্রেশন নম্বরটি খুঁজে পেলাম। অথচ ফল প্রকাশের মাত্র ১৯ দিন আগে বাবা এমন এক ঠিকানায় চলে গেলেন, যেখান থেকে কোনো ফলাফল আর পৌঁছায় না। আজও মনে হয়, তিনি যদি আর কয়েকটা দিন বেঁচে থাকতেন।”

ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে শিহাব বলেন, আইনকে নিরপেক্ষভাবে প্রয়োগ করে জনগণের আস্থা অর্জনই হবে তাঁর প্রধান লক্ষ্য। একজন সৎ, দক্ষ ও মানবিক পুলিশ কর্মকর্তা হিসেবে অপরাধ দমন, জননিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর পুলিশিংয়ের মাধ্যমে মানুষের দোরগোড়ায় কার্যকর সেবা পৌঁছে দিতে চান তিনি।

শিহাব খানের এই সাফল্যে পরিবার, শিক্ষক, সহপাঠী, এলাকাবাসী ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের মধ্যে আনন্দের পাশাপাশি আবেগও ছড়িয়ে পড়েছে। তাঁদের প্রত্যাশা, সততা, দক্ষতা ও মানবিক মূল্যবোধের মাধ্যমে শিহাব বাংলাদেশ পুলিশের একজন আদর্শ কর্মকর্তা হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করবেন।

ফেসবুকে আমরা

মন্তব্য করুন

guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted

সর্বাাধিক পঠিত নিউজ

Scroll to Top